পাতা:মুর্শিদাবাদ কাহিনী.djvu/১৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
১১
রাজা উদয়নারায়ণ

অর্থদণ্ডাদির তো কথাই নাই। এই বর্ণনা অতিরঞ্জিত হইলেও জমিদারগণ যে মুর্শিদকুলী খাঁর সময়ে যারপরনাই কষ্ট ভোগ করিয়াছিলেন, তাহার অনেক প্রমাণ আছে। এইরূপ অযথা অত্যাচারে হিন্দু জমিদারগণ অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। লজ্জায়, অপমানে, কষ্টে তাঁহারা প্রতিনিয়ত আপনাদিগের মৃত্যু কামনা করিতে লাগিলেন। মনুষ্য সহস্রগুণে বলহীন হইলেও, অত্যাচারের ঝটিকা যখন তাহাকে আক্রমণ করে, তখন তাহা অতিক্রম করিতে প্রাণপণে প্রয়াস পাইয়া থাকে; তখন তাহার ক্ষীণ শক্তি দৃঢ়সংহত হয়। তাই মুর্শিদকুলী খাঁর রাজত্বে এই অত্যাচার অসহ্য হওয়ায়, বাঙ্গলায় দুইজন হিন্দুবীরের অভ্যুদয় হইল। যে-বাঙ্গলা দ্বাদশ ভৌমিকের জননী, রাজা প্রতাপাদিত্য প্রভৃতি যাঁহার সন্তান, তাঁহা হইতে দুই-একজন পুরুষকারসম্পন্ন ব্যক্তির যে-অভ্যুদয় হইবে, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নহে। উক্ত দুই জনের মধ্যে একজন ভূষণার জমিদার রাজা সীতারাম রায়; দ্বিতীয়, রাজসাহীর জমিদার রাজা উদয়নারায়ণ রায়। সীতারাম রায়ের বিবরণ অনেকেই সবিশেষ অবগত আছেন; কিন্তু উদয়নারায়ণের বিষয় সকলে সম্যগ্‌রূপে জ্ঞাত না থাকায়, এ প্রবন্ধে তাঁহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদত্ত হইতেছে। কিরূপে তিনি মুর্শিদকুলী খাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করিয়াছিলেন, ইহা হইতে অনেকেই তাহার অনুমান করিতে পরিবেন।

 রাজা উদয়নারায়ণ রায় মুর্শিদাবাদের বড়নগরের নিকটস্থ বিনোদ-নামক গ্রামে জন্ম পরিগ্রহ করেন বলিয়া কথিত হইয়া থাকে।[১] বড়নগর ভাগীরথী-তীরবর্তী এবং রানী ভবানীর প্রিয় বাসস্থান ছিল। বিনোদ তাহারই নিকটস্থিত। এই বড়নগরই আবার উদয়নারায়ণের রাজধানী। উদয়নারায়ণ বংশীয়দের উপাধি লালা ছিল; এই লালা হইতে তাঁহাকে কায়স্থ-বংশসম্ভূত মনে করা যাইতে পারে। কিন্তু তাঁহারা শাণ্ডিল্যগোত্রীয় রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ; অন্য কোন কারণে তাহাদের লালা উপাধি হয়। উদয়নারায়ণ জঙ্গীপুরের সমীপবর্তী গণকরবাসী ভরদ্বাজগোত্রীয় ঘনশ্যাম রায়ের কন্যা শ্রীমতীর পাণিগ্রহণ করেন। তাঁহার পুত্রের নাম সাহেবরাম।[২] যৎকালে মুর্শিদকুলী

    গ্লাডউইন সাহেব উক্ত ’তারিখ বাঙ্গলার’ অনুবাদ করেন। এই বৈকুষ্ঠের কথা গ্রান্ট ও স্টুয়ার্ট প্রভৃতির গ্রন্থে দৃষ্ট হয়। মুর্শিদাবাদের বর্তমান কেল্লার দক্ষিণ তোরণদ্বারের সম্মুখে তাহার স্থান নির্দেশের চেষ্টাও হইয়া থাকে; কিন্তু কেহ কেহ এই বৈকুণ্ঠনির্মাণের কথায় সন্দিহান হইয়া থাকেন। বৈকুণ্ঠে অবিশ্বাস করিলেও, কুলী খাঁর সময়ে জমিদারদিগের প্রতি অত্যাচার একেবারে অস্বীকার করা যায় না; তাহার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে এ বিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা করা হইয়াছে।

  1. কাহারও কাহারও মতে কিরীটেশ্বরীর নিকট বেনেপুর তাঁহার জন্মস্থান; কিন্তু তাহা প্রকৃত নহে।
  2. নাটোর রাজবাটী হইতে শ্রীকণ্ঠ ও নীলকণ্ঠ নামে উদয়নারায়ণের দুই পুত্র বৃত্তি পাইতেন বলিয়া শুনা যায়। কিন্তু সাহেবরাম ব্যতীত আমরা তাঁহার আর কোন পুত্রের বিশেষরূপ পরিচয় পাই নাই।