বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:যাত্রা-সহচরী - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৭).pdf/১১৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১১০
জীবন-নাট্য

 মেয়েটির আবার চুল হইয়াছিল, কিন্তু তেমন ঘন লম্বা গোছ বাঁধে নাই, তার চোখের কোল ভরিয়াছিল, কিন্তু দৃষ্টিতে সে চঞ্চল আবেশ ছিল না; রং ফিরিয়াছিল, কিন্তু আগেকার সেই চৌদ্দ বছরের মেয়ের উচ্ছল লারণ্য ফিরে নাই; হৃদয়ের অন্তরে প্রণয় জমাট বাঁধিয়াছিল, কিন্তু বাহিরের সেই উচ্ছ্বসিত চাঞ্চল্য এখন শিথিল হইয়া গিয়াছিল। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে ভালো বাসিয়া ছেলেটি বাইশ বছরের মেয়েকে বিবাহ করিল—তবু তাহাকে ভালোবাসিত।

 ভালোবাসিত; কিন্তু আগেকার সেই ব্যগ্রতা আর ছিল না; অনাবশ্যক বকুনি থামিয়া গিয়াছিল; পলকে পলকে চাওয়াচাওয়ি ও চুরি করিয়া হাসাহাসি বিদায় লইয়াছিল, মুহূর্ত অদর্শনে প্রলয়বোধ এখন ঘরকন্নার কাজের মাঝে ডুব দিয়াছিল।

 ক্রমে ক্রমে দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে হইল। মেয়েটি বাপের প্রাণ, তার নয়নতারা, তার অনন্ত সান্ত্বনা।

 মেয়েটি যত বড় হইতে লাগিল তত তার মধ্যে তার মায়ের অতীত ছবি ফুটিয়া উঠিতে লাগিল; আর তত সে বাপের হৃদয় অধিকার করিতে লাগিল। মেয়ের দশ বৎসর বয়সে তার মায়ের সেই চৌদ্দ বৎসরের ছবি বাপের চোখে নূতন হইয়া দেখা দিল।

 বাপ সময় পাইলেই মেয়ের কাছটিতে লাগিয়া থাকিত; মেয়েকে যতটা পারে চোখে চোখে সে রাখে। মেয়েকে লইয়াই বাপ ব্যস্ত, মেয়ের মায়ের খবর লওয়া বড় একটা ঘটিয়া উঠে না।

 দুর্বল শরীরে সন্তান প্রসব ও ঘরকন্নার খাটুনিতে মায়ের শরীর ভাঙিয়া গিয়াছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজে ব্যস্ত, দেখা সাক্ষাৎ বড় একটা ঘটে না। তবু ভালোবাসা ছিল। কিন্তু যেমনটি ছিল তেমন কি?