বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:যাত্রা-সহচরী - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৭).pdf/১১৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১১২
জীবন-নাট্য

 আরো দুটি কন্যা জন্মিয়াছে—কিন্তু তাঁরা তাহার মতো নয়, এ কথা তার বাপের মনে জাগে।

 আর স্ত্রী? যার তুল্য নারী এ জগতে আর ছিল না, এখন তার সে মোহিনী ঘুচিয়া গেছে, বিশুষ্কমঞ্জরী লতার মতো একদিনের যাহা শ্রী ছিল এখন নষ্ট হইরা তাহাই তাহাকে অধিকতর কুশ্রী করিয়া তুলিয়াছে।

 জীবনেরও স্ফূর্তিতে আনন্দে ভাটা পরিয়াছে। বার্দ্ধক্য চুপিচুপি ঘাড় ধরিয়া পিঠ কুঁজা করিয়া দিতেছে, পা বাঁকা ও কম্পিত করিয়া তুলিতেছে।

 ঘরকন্নারও সে শ্রী নাই। একা গিন্নি অনেকগুলি ছেলেপুলে সাম্‌লাইতে পারে না। তাহারা চেয়ারের ঠ্যাং ভাঙে, বালিসের তুলো বাহির করে; চুনকাম-করা দেয়ালে কালি ছড়ায়, গানের বদলে ছেলেদের কান্না গৃহখানিকে ভরিয়া রাখে। কাজেই কর্তা-গিন্নির নেজাজ চটা, কথা কড়া, ব্যবহার রূঢ় হইয়া উঠিতেছে। কর্তা-গিন্নিরও এখন ছাড়াছাড়ি, আগেকার সে সোহাগসম্ভাষণ এখন খুঁজিয়া মনে করিতে হয়।

 কর্তার বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন গিন্নির মৃত্যু হইল। তখন বুড়োর মনে অতীত যৌবনের সকল স্মৃতি নূতন হইয়া উঠিল, চোখের সাম্‌নে সেই চৌদ্দ বছরের ফুটন্ত কলি মেয়েটিরই ছবি জাগিতে লাগিল। বুড়ো শোকে বড় কাতর হইল—সে শোক, বুড়ীর মৃত্যুতে নয়,—এ শোক সেই চৌদ্দ বছরের কিশোরীর স্মৃতির জন্য,—সেই বাইশ বছরের বধূর ভালোবাসার জন্য, এবং বুড়ীর গিন্নিপনার জন্য অল্প স্বল্প।

 বুড়ো ছেলেমেয়েগুলিকে লইয়া থাকে। মেয়েগুলির বিয়ে হইল: মেয়েরা শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেল; ছেলেগুলি যে যার কাজে দেশ বিদেশে ছড়াইয়া পড়িল; শ্মশান আগুলিয়া রহিল শুধু সেই বুড়ো।

 বছরখানেক ধরিয়া বুড়ীর এক-একটি গুণের কথা একশবার বলিয়া সে