না। যাহাকে নিত্য নিয়ত দেখিতেছে তাহাদের সেই আজন্মকালের পরিচিত ফট্কে, তাহাকে গ্রামবাসিগণ ভিক্ষা দিতে চাহিত না। তাহারা তাহাদের গ্রামে নিত্য নিত্য সমাগত কত অপরিচিত ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিত; প্রত্যেক গৃহস্থ একাধিক অতিথির পরিচর্যা করিত; কারণ ইহারা এই নূতন আসিয়াছে, আর কখনো আসে নাই, আর কখনো আসিবে কি না তাহারো ঠিকানা নাই, সুতরাং মোটের উপর অধিক খরচ পড়িলেও একদিন বৈ নয় মনে করিয়া নিত্যই নূতন বহু ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে কখনোই কেহ্ আপত্তি করিত না। কিন্তু তাহাদের পরিচিত ফট্কে কেন যে তাহাদের দয়ার উপর নিত্যকার দাবী লইয়া বসিয়া আছে তাহা তাহারা বুঝিতে পারিত না এবং বুঝিতে পারিত না বলিয়াই তাহাকে সহ্য করিতে পারিত না। তাহাকে দেখিলেই তাহারা বিরক্ত হইয়া উঠিত; তাহার পঙ্গুকদর্যতাও সুখদর্শন বলিয়া মনে হইত না।
কিন্তু তথাপি ফটিকচাঁদ সে গ্রাম ছাড়িয়া নড়িবার নামটি করিত না। সে সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে আপনার ক্ষুদ্র গ্রামখানি ছাড়া সংসারে অপর গ্রামের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই অজ্ঞ ছিল। একবার গ্রামের বাহির হইয়া হুগলি গিয়াছিল, কিন্তু উঃ, সে কী অবস্থায়! বাপরে! মনে করিলে এখনো হৃৎকম্প হয়! যে পুলিশকে সে আবাল্য যমদূতের অপেক্ষাও ডরাইত, ভূতের মতো যাহার নাম করিলে শরীর শিহরিত, সেই পুলিশ কিনা তাহাকে টানিতে টানিতে হুগলি লইয়া গিয়া তাহার পা দুখানা কাটিয়া দিল! বাহিরের সহিত তাহার পরিচয় তো এই ভয় ও বিপদের ভিতর দিয়া, সে বাহিরকে বিশ্বাস করিবে কেমন করিয়া? তারপর সেই অপয়া রেলের লাইনটা গণ্ডির মতো কি একটা বিকট আশঙ্কা দিয়া তাহাকে ঘিরিয়া রাখিয়াছিল, সে উহা ডিঙাইয়া কোথায় গিয়া আবার কোন্ বিপদে পড়িবে? সুতরাং সে সমস্ত হৃদয়হীন বিদ্রূপ ও তিরস্কার