বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:যাত্রা-সহচরী - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৭).pdf/১৩২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১২৮
নষ্টোদ্ধার

সূর্য উদয়মাত্রেই যাদুকরের মতো চারিদিকে মায়ার খেলা জুড়িয়া দিল। সমস্ত রাত্রি ধরিয়া ঝুরো চিনির মতো চূর্ণ তুকার পল্লবহীন বৃক্ষগুলিতে ঢাকিয়া এক একটি চিনির খেলনার মতো সাজাইয়া রাখিয়াছিল; যাদুকর সূর্য উদয় হইবামাত্র সেগুলিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গোলাপী প্রবালের তোড়া করিয়া তুলিল। এই ইন্দ্রজাল রচনা করিতে গিয়া সূর্য তাহার তৃপ্তিপ্রদ তপ্তকিরণ বন্ধুর হাসির মতন প্রাভাতিক পথিকদের গায়ে অপক্ষপাতে ঢালিয়া ঢালিয়া দিতেছিল। তাহার হাসি জামাজোড়া-আঁটা আপিসযাত্রী বড় সাহেবের প্রতি, কম্পিতকলেবর কেরানীর প্রতি, ছিন্নচীর দিনমজুরের প্রতি, ট্রামগাড়ীর ক্লান্ত কণ্ডাকটারের প্রতি, কিংবা নিজে শীতে কাঁপিয়া পরকে গরম করিতে অভিলাষী গরম গরম চীনেবাদামওয়ালার প্রতি সমভাবেই বর্ষিত হইতেছিল। তাহার হাসিতে বিশ্বজগৎ খুশী হইয়া উঠিয়াছিল। অপরপক্ষে শ্রীযুক্ত গোদ্‌ফ্রয়ের যে জাগরণ, সে শুধু অসন্তোষ আর ফসাদে ভরা। রাত্রে তিনি কৃষিসচীবের প্রাসাদে ভোজের নিমন্ত্রণে সূপ হইতে পায়েস পিষ্টক পর্যন্ত চাখিয়া আসিয়াছেন, সে-সব এখন সাতচল্লিশ বছরের পুরাতন পাকস্থলীতে হুলস্থূল বাধাইয়া তুলিয়াছে; অম্বলে আর বুকজ্বালায় তাঁহার মেজাজটাও জ্বালাতন হইয়া উঠিয়াছিল।

 শ্রীযুক্ত গোদ্‌ফ্রয় যে-ধরণে ডাকঘণ্টার দড়ি টানিলেন, তাহা শুনিয়াই তাঁহার খাস খান্‌সামা শার্ল্‌ তাঁহার দাড়ি কামাইবার গরম জল তাড়াতাড়ি লইয়া যাইতে যাইতে রান্নাঘরের ঝিকে চোখ ঠারিয়া বলিয়া গেল— “হাঁ হাঁ!...বাঁদরটা আজ সকালবেলাই মার্‌-মার্‌ করতে করতে উঠেছে... ওলো গ্যারত্রিদ্, হাঁ ক’রে আর ভাবছিস্ কি, আজকে কপালে অনেক দুঃখু অনেক ভোগান্তি আছে!...” শার্ল ঘরের চৌকাঠের নিকট পৌঁছিয়া ভালো মানুষটির মতো পরম নম্রতায় দৃষ্টি নত করিল, সসম্ভ্রমে মুনিবের