অল্পদিন হইল এ বাড়ীতে তিনি আসিয়াছেন। কেহ তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিত না, তিনিও কাহারও সহিত আলাপ করিতেন না। খুব কাছাকাছি না হইলেও অল্প দূরে আরও বাড়ী ছিল, পথে যাইতে সময় সময় নৃত্যগীতের শব্দ শোনা যাইত, কিন্তু মীরমঞ্জিল স্তব্ধ, মনুষ্যকণ্ঠও শুনিতে পাওয়া যাইত না। সে-পথে গাড়ী ঘোড়া কি মোটর অধিক চলিত না, সুতরাং নসীর খাঁর মোটরও প্রায় নিঃশব্দে আসা-যাওয়া করিত, হর্ণের শব্দ বড়-একটা শোনা যাইত না। তিনি কখন্ বাড়ী থাকিতেন, কখন্ বাহিরে যাইতেন তাহার কোনো স্থিরতা ছিল না। ভৃত্যেরা কলের মত কাজ করিত, বাহিরে কোথাও বেড়াইতে যাওয়া বা অন্য বাড়ীর লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করা তাহাদের ছিল না। দুই-একবার অপর লোকেরা তাহাদের সহিত আলাপ করিবার চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তাহারা অল্পভাষী দেখিয়া সে চেষ্টা পরিত্যাগ করিল।
নসীর খাঁকে দেখিলে তাঁহার এরূপ একা বাস করিবার কারণ কিছুই বুঝা যাইত না। নবীন যুবা পুরুষ, উন্নতকায়, দীর্ঘমূর্ত্তি, সুশ্রী সতেজ মুখ, অল্প শ্মশ্রু, আয়ত বক্ষ, ক্ষীণ কটি; বলিষ্ঠ বুদ্ধিমান্ আকৃতি। অর্থের অপ্রতুল মনে হয় না, মোটর গাড়ী আর মোটর-নৌকা ধনী না হইলে রাখিতে পারে না, আর এই বয়সে যৌবনের উত্তেজনা, কত রকম আমোদ-প্রমোদে চিত্ত আকৃষ্ট হয়। নসীর খাঁর পরিচ্ছদ, আহার ইত্যাদি ধনীর মত, কিন্তু কোনো রকম সখ তাঁহার দেখিতে পাওয়া যাইত না। ঘরে ঘরে বিনা তারের রেডিও, তাঁহার তাহা ছিল না। বাড়ীতে একটা গ্রামোফোন পর্য্যন্ত নাই। সখের মধ্যে মোটর স্থলপথে ও জলপথে। কোথায় বেড়াইতে যাইতেন তাহাও বড়-একটা কেহ জানিত না।