পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১০২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


b*8 রবীন্দ্র-রচনাবলী এ কবিতাতে একটি বিশেষ ভাবকে সমগ্র রাখা হয় নাই। মাঝখানে ভাঙ্গিয় পড়িয়াছে। যে বিশাল কল্পনায় একটি ভাব সমগ্র প্রতিবিম্বিত হয়, যাহাতে যোড়াতাড়া দিতে হয় না, সে কল্পনা ইহাতে প্রকাশিত হয় নাই। অরণ্য, পৰ্ব্বত, প্রাস্তরে যত কিছু মুখ পাওয়া যায়, তাহাই যে রাখালের আয়ত্তাধীন ; যে ব্যক্তি গোলাপের শয্যা ফুলের টুপি ও পাতার আঙিয়া নিৰ্ম্মাণ করিয়া দিবার লোভ দেখাইতেছে, সে স্বর্ণ-খচিত পাদুকা, রজতের পাত্র, হস্তি-দস্তের আসন পাইবে কোথায় ? তৃণ-নিৰ্ম্মিত কটিবন্ধের মধ্যে কি প্রবাল শোভা পায় ? কবিকঙ্কণের কমলে-কামিনীতে একটি রূপসী ষোড়শী হস্তী গ্রাস ও উদগার করিতেছে, ইহাতে এমন পরিমাণ সামঞ্জস্তের অভাব হইয়াছে, যে, আমাদের সৌন্দৰ্য্য-জ্ঞানে অত্যন্ত আঘাত দেয়। * শিক্ষিত, সংযত, মার্জিত কল্পনায় একটি রূপসী যুবতীর সহিত গজাহার ও উদগীরণ কোন মতেই একত্রে উদয় হইতে পারে না । কল্পনারও শিক্ষা আবশ্যক করে । যাহাদের কল্পনা শিক্ষিত নহে, তাহারা অতিশয় অসম্ভব অলৌকিক কল্পনা করিতে ভালবাসে ; বক্র দর্পণে মুখ দেখিলে নাসিক পরিমাণাধিক বৃহৎ এবং কপাল ও চিবুক নিতান্ত হ্রস্ব দেখায়। অশিক্ষিতদের কুগঠিত কল্পনা-দর্পণে স্বাভাবিক দ্রব্য যাহা কিছু পড়ে তাহার পরিমাণ ঠিক থাকে না ; তাহার নাসা বৃহৎ ও তাহার কপাল খৰ্ব্ব হইয়া পড়ে। তাহারা অসঙ্গত পদার্থের জোড়াতাড়া দিয়া এক একটা বিকৃতাকার পদার্থ গড়িয়া তোলে । তাহারা শরীরী পদার্থের মধ্যে অশরীরী ভাব দেখিতে পায় না। তথাপি যদি বল বালকের কবি, তবে নিতান্ত বালকের মত কথা বলা হয় । প্রাচীন কালে অনেক ভাল কবিতা রচিত হইয়া গিয়াছে বলিয়াই, বোধ হয়, এই মতের স্বষ্টি হইয়া থাকিবে যে, অশিক্ষিত ব্যক্তিরা বিশেষরূপে

  • অনেকে তর্ক করেন যে, গণেশকে দুর্গ এক একবার করিয়া চুম্বন করিতেছিলেন, তাহাই দূর হইতে দেখিয়া ধনপতি গজাহার ও উদগীরণ কল্পনা করিয়াছিলেন । কিন্তু তাহ যথার্থ নহে। কারণ, কবিকঙ্কণচণ্ডীতেই আছে যে, চৌষটি যোগিনী পদ্মের দলরূপ ধারণ করিল, ও জয় হস্তিনীরূপে রূপান্তরিত হইল। অতএব গণেশের সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই। কেহ বা তর্ক করেন যে, যখন কবির উদ্দেগু বিস্ময় ভাবের উদ্দীপন কর, তখন, বর্ণন। যাহাতে অভূত হয়, তাহারই প্রতি কবির লক্ষ্য। কিন্তু এ কথার কোন অর্থ নাই। স্বকল্পনার সহিত বিস্ময় রসের কোন মনাস্তুর নাই ।

যখন কবি অগাধ সমূত্রের মধ্যে মরালশোভিত কুমুদ কহলার পদ্ম বনের মধ্যে এক রূপসী ষোড়শী প্রতিষ্ঠিত করিলেন ; সমস্তই সুন্দর, নীল জল, সুকুমার পদ্ম, পুষ্পের সুগন্ধ, ভ্রমরের গুঞ্জন, ইত্যাদি, তখন মধ্য হইতে এক গজাহার জানিয়া আমাদের কল্পনার অমন একটা নিদারুণ আঘাত দিবার তাৎপৰ্য্য কি ? স্বম্বর পদার্থ বেমন কৰিত্নপূর্ণ বিস্ময় উৎপন্ন করিতে পারে, এমন কি আর কিছুতে পারে? অপার সমুদ্রের মধ্যে পয়াসীনা ষোড়শী রমণীই কি যথেষ্ট বিস্ময়ের কারণ নহে ?