পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সমালোচন৷ 切ー সুরের রাগ রাগিণী নহে, সঙ্গীত ভাবের রাগ রাগিণী । আমাদের কথা এই যে,— কবিতা যেমন ভাবের ভাষা, সঙ্গীতও তেমনি ভাবের ভাষা । তবে, কবিতা ও সঙ্গীতে প্রভেদ কি ? আলোচনা করিয়া দেখা যাক । s আমরা সচরাচর যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি, তাহা যুক্তির ভাষা । “স্থা” কি “না,” ইহা লইয়াই তাহার কারবার । “আজ এখানে গেলাম,” “কাল সেখানে গেলাম,” “আজ সে আসিয়াছিল,” “কাল সে আসে নাই,” “ইহা রূপা,” “উহ। সোনা,” ইত্যাদি। এ সকল কথার উপর যুক্তি চলে। “আজ আমি অমুক জায়গায় গিয়াছিলাম, ইহা আমি নানা যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করিতে পারি। দ্রব্যবিশেষ রূপা কি সোনা ইহাও নানা যুক্তির সাহায্যে আমি অন্যকে বিশ্বাস করাইয়া দিতে পারি। অতএব, সচরাচর আমরা যে সকল বিষয়ে কথোপকথন করি, তাহ বিশ্বাস করা না-করা যুক্তির নূ্যনাধিক্যের উপর নির্ভর করে । এই সকল কথোপকথনের জন্য আমাদের প্রচলিত ভাষা—অর্থাৎ গদ্য নিযুক্ত রহিয়াছে। কিন্তু বিশ্বাস করাইয়া দেওয়া এক, আর উদ্রেক করাইয়া দেওয়া স্বতন্ত্র । বিশ্বাসের শিকড় মাথায়, আর উদ্রেকের শিকড় হৃদয়ে । এই জন্য, বিশ্বাস করাইবার জন্য যে ভাষা, উদ্রেক করাইবার জন্য সে ভাষা নহে। যুক্তির ভাষা গদ্য আমাদের বিশ্বাস করায়, আর কবিতার ভাষা পদ্য আমাদের উদ্রেক করায় । যে সকল কথায় যুক্তি খাটে, তাহ অন্যকে বুঝান অতিশয় সহজ ; কিন্তু যাহাতে যুক্তি থাটে না, যাহা যুক্তির আইন কামুনের মধ্যে ধরা দেয় না, তাহাকে বুঝান সহজ ব্যাপার নহে। “কেন” নামক একটা চশমা-চক্ষু, তুর্দান্ত রাজাধিরাজ যেমনি কৈফিয়ং তলব করেন, আমনি সে আসিয়া হিসাব নিকাশ করিবার জন্য হাজির হয় না। যে সকল সত্য মহারাজ “কেন”র প্রজা নহে, তাহাদের বাসস্থান কবিতায় । আমাদের হৃদয়-গত সত্য সকল “কেন”কে বড় একটা কেয়ার করে না । যুক্তির একটা ব্যাকরণ আছে, অভিধান আছে, কিন্তু আমাদের রুচির অর্থাৎ সৌন্দৰ্য্যজ্ঞানের আজ পর্য্যস্ত একটা ব্যাকরণ তৈয়ারি হইল না। তাহার প্রধান কারণ, সে আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নিৰ্ভয়ে বাস করিয়া থাকে—এবং সে দেশে “কেন”- আদালতের ওয়ারেন্ট জারি হইতে পারে না। একবার যদি তাহাকে যুক্তির সামনে খাড়া করিতে পারা যাইত, তাহা হইলেই তাহার ব্যাকরণ বাহির হইত। অতএব, যুক্তি যে সকল সত্য বুঝাইতে পারে না বলিয়া হাল ছাড়িয়া দিয়াছে, কবিত। সেই সকল সত্য বুঝাইবার ভার নিজস্কন্ধে লইয়াছে। এই নিমিত্ত স্বভাবতই যুক্তির ভাষা ও কবিতার ভাষা স্বতন্ত্র হইয়া পড়িয়াছে । অনেক সময় এমন হয় যে, শত সহস্র প্রমাণের সাহায্যে একটা সত্য আমরা বিশ্বাস করি মাত্র, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে