পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সমালোচনা | ১৩৩ হইল, তাহা চৌর্য্যবৃত্তির একটি স্বশ্ৰাব্য ছুতা বলিয়া বোধ হয় । যাহারা ইংরাজি হইতে দুই হাতে লুট করিতে থাকেন, বাঙ্গালাটাকে এমন করিয়া তোলেন যাহাতে /V/ তাহাকে আর ঘরের লোক বলিয়া মনে হয় না, তাহারাই বলেন ভাষা-বিশেষের নিজস্ব কিছুই নাই, তাহারাই অমান বদনে পরের সোনা কানে দিয়া বেড়ান। আমারই যে নিজের সোনা আছে এমন নয়, কিন্তু তাই বলিয়া একটা মতের দোহাই দিয়া সোনাটাকে নিজের বলিয়া জাক করিয়া বেড়াই না । ভিক্ষা করিয়া থাকি, তাহাতেই মনে মনে ধিক্কার জন্মে, কিন্তু অমন করিলে যে স্পষ্ট চুরি করা হয়। সাম্য এবং বৈষম্য, দুটাকেই হিসাবের মধ্যে আনা চাই । বৈষম্য না থাকিলে জগৎ টিকিতেই পারে না । সব মানুষ সমান বটে, অথচ সব মানুষ আলাদা । দুটো মানুষ ঠিক এক ছাচের, এক ভাবের পাওয়া অসম্ভব, ইহা কেহ অস্বীকার করিতে পারেন না । তেমনি দুইটি স্বতন্ত্র জাতির মধ্যে মনুষ্য-স্বভাবের সাম্যও আছে, বৈষম্যও আছে । আছে বলিয়াই রক্ষা, তাই সাহিত্যে আদান প্রদান বাণিজ্য ব্যবসায় চলে । উত্তাপ যদি সৰ্ব্বত্র একাকার হইয়া যায়, তাহা হইলে হাওয়া খেলায় না, নদী বহে না, প্রাণ টেকে না । একাকার হইয়া যাওয়ার অর্থ ই পঞ্চত পাওয়া। অতএব আমাদের সাহিত্য যদি বাচিতে চায়, তবে ভাল করিয়া বাঙ্গালা হইতে শিখুক । ভাবের ভাষায় অতুবাদ চলে না । ছাচে ঢালিয়া শুষ্ক জ্ঞানের ভাষার প্রতিরূপ নিৰ্ম্মাণ করা যায়। কিন্তু ভাবের ভাষা হৃদয়ের স্তন্য পান করিয়া, হৃদয়ের সুখ দুঃখের দোলায় দুলিয়া মানুষ হইতে থাকে। সুতরাং তাহার জীবন আছে। ছাচে ঢালিয়৷ তাহার একটা নিজাব প্রতিমা নিৰ্ম্মাণ করা যাইতে পারে, কিন্তু তাহ চলিয়া ফিরিয়া বেড়াইতে পারে না, ও হৃদয়ের মধ্যে পাষাণ-ভারের মত চাপিয়া পড়িয়া থাকে। Force of Gravitation-কে ভারাকর্ষণ শক্তি বলিলে কিছুই আসে যায় না। কিন্তু ইংরাজিতে Liberty, ও Freedom শব্দে যে ভাবটি মনে আসে, বাঙ্গালায় স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য শব্দে ঠিক সে ভাবটি আসে না, কোথায় একটুখানি তফাৎ পড়ে। ইংরাজিতে যেখানে বলে, “Free as mountain air,” আমরা যদি সেইখানে বলি “পৰ্ব্বতের বাতাসের মত স্বাধীন,” তাহা হইলে কি কথাটা প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করে ? আমরা আজকাল ইংরাজির ভাবের ভাষাকে বাঙ্গালায় অনুবাদ করিতেছি—মনে করিতেছি ইংরাজি ভাবটি বুঝি ঠিক বজায় রাখিলাম, কিন্তু তাহার প্রমাণ কি ? আমাদের সাহিত্যে এখন ইংরাজি-ওয়ালারা যাহা লেখেন, ইংরাজি-ওয়ালারাই তাহ পড়েন, ভাবগুলিকে মনে মনে ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া লন–র্তাহাদের যাহা কিছু ভাল লাগে, ইংরাজির সহিত মিলিতেছে মনে করিয়া ভাল লাগে। কিন্তু ষে ব্যক্তি