পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৬০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8& | রবীন্দ্র-রচনাবলী তাহার চারিদিকের মণ্ডলী আমরা দেখিতে পাই না। কিন্তু তাহার সেই খাস্তাধার মণ্ডলী তাহার সঙ্গে সঙ্গে অলক্ষিত ভাবে ফিরিতেছে। ষে ব্যক্তি সৌন্দৰ্য্যপ্রিয়, সে তাহার দেহের মধ্যে, তাহার চৰ্ম্মাবরণটুকুর মধ্যে, বাস করে না। সে তাহার চারিদিকের তরুলতার মধ্যে আকাশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মধ্যে বাস করে । সে যেখানেই যায় চন্দ্রস্থৰ্য্যময় আকাশ তাহার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে, তৃণ-পত্র-পুষ্পময়ী বনশ্ৰী তাহাকে ঘিরিয়া রাখে । ইহারা তাহার ইন্দ্রিয়ের মত । চন্দ্র সুৰ্য্যের মধ্য দিয়া সে কি দেখিতে পায় ; কুসুমের সৌগন্ধ্য ও সৌন্দর্য্যের সাহায্যে তাহার হৃদয়ের ক্ষুধা নিবৃত্ত হইতে থাকে । এই মণ্ডলীর বিস্তার লইয়া মাতুষের ছোটবড়ত্ব । মকুষ্যের যে,দেহ মাপিতে পারা যায়, সে দেহ গড়ে প্রায় সকলেরই সমান । কিন্তু যে দেহ দেখা যায় না, মাপা যায় না, তাহার ছোট বড় সামান্য নহে । এই দেহ, এই মণ্ডলী, এই বৃহৎ দেহ, এই অবস্থা-গোলক, যাহার মধ্যে আমাদের শাবক আত্মার খাদ্য সঞ্চিত ছিল, ইহাই ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া সে পরলোকে জন্মগ্রহণ করে । মানুষ চেন । যেমন মানুষের বৃহৎ দেহটি আমরা দেখিতে পাই না, তেমনি যথার্থ মানুষ যে তাহাকেও দেখিতে পাই না । এই জন্য কাহার ও জীবনচরিত লেখা সম্ভব নহে । কারণ, লেখকের মানুষের কাজ দেখিয়া তাহার জীবনচরিত লেখেন । কিন্তু যে গোটাকতক কাজ মানুষ করিয়াছে তাই তিনি দেখিতে পান, লক্ষ লক্ষ কাজ, যাহা সে করে নাই, তাহা ত তিনি দেখিতে পান না । আমরা তাহার কতকগুলা কাজের টুকরা এখান ওখান হইতে কুড়াইয়া জোড়া দিয়া একটা জীবনচরিত খাড় করিয়া তুলি, কিন্তু তাহার সমগ্রটি ত দেখিতে পাই না। তাহার মধ্যস্থিত যে মহাপুরুষ অসংখ্য অবস্থায় অসংখ্য আকার ধারণ করিতে পারিত, তাহাকে ত দেখিতে পাই না । তাহার কাজ-কর্মের মধ্যে বরঞ্চ সে ঢাকা পড়িয়া যায় ; আমরা কেবল মাত্র উপস্থিতটুকু দেখিতে পাই ; যত কাজ হইয়া গিয়াছে, যত কাজ হইবে, এবং যত কাজ হইতে পারিত, উপস্থিত কাৰ্য্য-খণ্ডের সহিত তাহার যোগ দেখিতে পাই না। আমরা মুহূৰ্ত্তে মুহূৰ্ত্তে এক-একটা কাজ দেখিয়া সেই কাৰ্য্য-কারকের মুহূৰ্ত্তে মুহূৰ্ত্তে এক-একটা নাম দিই। সেই নামের প্রভাবে তাহার ব্যক্তি-বিশেষত্ব ঘুচিয়া যায়, সে একটা সাধারণ শ্রেণীভূক্ত হইয় পড়ে, সুতরাং ভিড়ের মধ্যে তাহাকে হারাইয়া ফেলি । আমরা রামকে যখন খুনী বলি, তখন সে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ খুনীর সহিত এক হইয়া যায়। কিন্তু রাম-খুনী