পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সমালোচনা ५> কেন ? বসন্ত আসিয়াছে বলিয়া কি কাক মিঠা ডাকিবে ? তাহ হইলে বিধাতা তাহাকে কাক করিলেন কেন ? সে যে বুদ্ধিমান পক্ষী! যখন কোকিল ডাকিতে থাকে, ফুল ফুটিয়া উঠে, বাতাস প্রাণ খুলিয়া দেয়, তখন সে শাখায় বসিয়া বুদ্ধিপূর্ণ ক্ষুদ্র চক্ষু মিটমিট করিতে থাকে, অবিশ্বাসের সহিত চারিদিকে চাহিয়া দেখে ও বেস্বরে ডাকিয় উঠে কা। বসন্তের সহিত তাহার স্বর মেলে না বলিয়া সে কি চুপ করিয়া থাকিবে ? সে যে বুদ্ধিমান জীব ! সে বলে, বসন্তের স্থর বেস্থর বলিতেছে ! যখন কোকিল ডাকে, অমনি সে ঘাড় নাড়িয়া বলে, কা—যখন ফুল ফুটে অমনি সে ঘাড় নাড়িয়া বলে কা—অর্থাৎ কিছুতেই সে সায় দিতে পারে না, সে বলে যে, আগাগোড়া স্বর মিলিতেছে না ! শুনা গেছে, মনুষ্যলোকে এমন অঙ্গহীন দেখা যায়, যাহার একটা কান নাই, এমন কি, দুইটা কানই খরচ হইয়া গেছে ; হে কাক, স্বভাবতই —জন্মাবধিই তোমার কানের অভাব—অতএব কে তোমার কান ধরিয়া শিখাইবে যে, তোমার গলাটাই বেস্থরা ! কিন্তু তবুও ফুল ফোটে কেন, তবুও কোকিল ডাকে কেন ? বসন্তের প্রাণের মধ্যে বসিয়া কে এমন একটা তানপুরা বাজাইতেছে, যাহাতে এত বেম্বরের মধ্যেও সে অমন মুর ঠিক রাখিতেছে! কিন্তু স্বর কি ঠিক থাকে ? সাধ কি যায় না গান বন্ধ করি ? ক’জনের প্রাণ এমন আছে, যাহারা বেতালা বেস্থর সঙ্গতের সহিত—অর্থাৎ অসঙ্গত সঙ্গতের সহিত গান গাহিয়া উঠিতে পারে ? কোকিলও তাহ পারে না ;—যখন বর্ষার সময় ভেকগুলা অসম্ভব ফুলিয়া উঠিয়া জগৎসংসারে ভাঙ্গা গলায় নিজের মত জারি করিতে থাকে—তখন কোকিজ চুপ করিয়া যায় । আচ্ছা, স্বীকার করিলাম—হে ভেকগণ, তোমাদেরই জয় ! তোমরা আরো ফুলিতে থাক—আরো লম্ফ দাও—আরো মক্‌ মক্‌ কর ! তোমরা কর্কশ কণ্ঠ লইয় জগতের গান-বন্ধ করিতে পারিয়াছ, অতএব তোমরাই জিতিলে ! হে বিধাতা, জগতে কাক স্বষ্টি করিয়াছ বলিয়া তোমার দোষ দিই না। কাকের অনেক কাজ আছে । কিন্তু তাহাকে যে কাজ দিয়াছ, সেই কাজেই সে লিপ্ত থাকে না কেন ? সৌন্দৰ্য্যপূর্ণ বসন্তের প্রাণের মধ্যে সে কেন তাহার কঠোর কণ্ঠের চঞ্চু বিধিতে থাকে ? কেন ? তাহার কারণ, বড় বড় বুদ্ধিমান লোকের সৌন্দর্য্যের উপর বড় একটা বিশ্বাস নাই, সৎ-উদ্দেশ্বের প্রতি অকাট্য সংশয় বিদ্যমান। এই জন্য সৎ-কার্য্যের নাম শুনিলেই ইহাদের সংশয়-কুঞ্চিত অধরেীষ্ঠের চারিদিকে পাণ্ডুবৰ্ণ মড়কের মত একটা বিষাক্ত হাসি ফুটিয়া ওঠে। অতি-বুদ্ধিমান জীবের সম্মুখের দাতের পাটিতে যে একটা দারুণ হাস্ত-বিষ আছে—হে জগদীশ্বর, সেই বিষ হইতে পৃথিবীর সমুদয় সংকাৰ্য্যকে রক্ষা কর ।