পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৯৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


१७ । । রবীন্দ্র-রচনাবলী জানিত । অতএব দেখা যাইতেছে, কবিরা স্ব স্ব সময়ের উচ্চতম আদর্শের কল্পনায় উত্তেজিত হইয়াই মহাকাব্য রচনা করিয়াছেন, ও সেই উপলক্ষে ঘটনাক্রমে যুদ্ধের বর্ণনা অবতারিত হইয়াছে—যুদ্ধের বর্ণনা করিবার জন্যই মহাকাব্য লেখেন নাই। _ কিন্তু আজকাল র্যাহারা মহাকবি হইতে প্রতিজ্ঞা করিয়া মহাকাব্য লেখেন, তাহার যুদ্ধকেই মহাকাব্যের প্রাণ বলিয়া জানিয়াছেন ; রাশি রাশি খটমট শব্দ সংগ্ৰহ করিয়া একটা যুদ্ধের আয়োজন করিতে পারিলেই মহাকাব্য লিখিতে প্রবৃত্ত হন। পাঠকেরাও সেই যুদ্ধবর্ণনামাত্রকে মহাকাব্য বলিয়া সমাদর করেন। হয়ত কবি স্বয়ং শুনিলে বিস্মিত হইবেন, এমন আনাড়িও অনেক আছে, যাহারা পলাশীর যুদ্ধকে মহাকাব্য বলিয়া থাকে । হেম বাবুর বৃত্রসংহারকে আমরা এইরূপ নাম-মাত্ৰ-মহাকাব্যের শ্রেণীতে গণ্য করি না, কিন্তু মাইকেলের মেঘনাদবধকে আমরা তাহার অধিক আর কিছু বলিতে পারি না । মহাকাব্যের সর্বত্রই কিছু আমরা কবিত্বের বিকাশ প্রত্যাশা করিতে পারি না। কারণ আট নয় সর্গ ধরিয়া, সাত আট-শ পাতা ব্যাপিয়া প্রতিভার স্ফূৰ্ত্তি সমভাবে প্রস্ফুটিত হইতে পারেই না । এই জন্যই আমরা মহাকাব্যের সর্বত্র চরিত্র-বিকাশ, চরিত্ৰ-মহত্ত্ব দেখিতে চাই । মেঘনাদবধের অনেক স্থলেই হয়ত কবিত্ব আছে—কিন্তু কবিত্বগুলির মেরুদণ্ড কোথায় ! কোন অটল আচলকে আশ্রয় করিয়া সেই কবিত্বগুলি দাড়াইয়া আছে ! যে একটি মহান চরিত্র মহাকাব্যের বিস্তীর্ণ রাজ্যের মধ্যস্থলে পৰ্ব্বতের ন্যায় উচ্চ হইয় উঠে, যাহার শুভ্ৰ তুষার-ললাটে স্বৰ্য্যের কিরণ প্রতিফলিত হইতে থাকে, যাহার কোথাও বা কবিত্বের স্যামল কানন, কোথাও বা অমুর্বর বন্ধুর পাষাণস্তপ, যাহার অন্তগূঢ় আগ্নেয় আন্দোলনে সমস্ত মহাকাব্যে ভূমিকম্প উপস্থিত হয়, সেই অভ্ৰভেদী বিরাট মূৰ্ত্তি মেঘনাদবধ কাব্যে কোথায়! কতকগুলি ঘটনাকে সুসজ্জিত করিয়া ছন্দোবন্ধে উপন্যাস লেখাকে মহাকাব্য কে বলিবে ? মহাকাব্যে মহৎ চরিত্র দেখিতে চাই ও সেই মহৎ চরিত্রের একটি মহৎ কাৰ্য্য মহৎ অসুষ্ঠান দেখিতে চাই । হীন ক্ষুদ্র তস্করের ন্যায় নিরস্ত্র ইন্দ্রজিতকে বধ করা, অথবা পুত্র-শোকে অধীর হইয়া লক্ষ্মণের প্রতি শক্তিশেল নিক্ষেপ করাই কি একটি মহাকাব্যের বর্ণনীয় হইতে পারে ? এইটুকু যৎসামান্ত ক্ষুদ্র ঘটনাই কি একজন কবির কল্পনাকে এত দূর উদ্দীপ্ত করিয়া দিতে পারে যাহাতে তিনি উচ্ছ্বসিত হৃদয়ে একটি মহাকাব্য লিখিতে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইতে পারেন ? রামায়ণ মহাভারতের সহিত তুলনা করাই অন্যায়, বুত্রসংহারের সহিত তুলনা করিলেই আমাদের কথার প্রমাণ হইবে। স্বৰ্গ-উদ্ধারের জন্য নিজের অস্থিদান,