পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৭৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন ᏬᎶ;Ꮔ যাত্রীর উৎসব এই প্ৰাঙ্গণের বাইরে বিশ্বের যে মন্দিরে সন্ধ্যাকাশের তারা জ্বলে উঠেছে, যেখানে অনন্ত আকাশের প্রাঙ্গণে সন্ধ্যার শান্তি পরিব্যাপ্ত, সেই মন্দিরের দ্বারে গিয়ে প্ৰণাম করতে তো মন কোনো বাধা পায় না। বিশ্বভুবনে ফুলের যে রঙ সহজে পুস্পকাননে প্রকাশ পেয়েছে, নক্ষত্ৰলোকে যে আলো সহজে জ্বলেছে, এখানে তো সে রঙ লাগা সহজ হয় নি, এখানে সম্মিলিত চিত্তের আলো তো সহজে জ্বলে নি । এই মুহুর্তে সন্ধ্যাকালের গন্ধগহন কুসুমের সভায়, নিবিড় তারারাজির দীপালোকিত প্রাঙ্গণে, বিশ্বের নমস্কার কী সৌন্দর্যে কী একান্ত নম্রতায় নত হয়ে রয়েছে ! কিন্তু, যেখানে দশজন মানুষ এসেছে সেখানে বাধার অন্ত নেই ; সেখানে চিত্তবিক্ষেপ কত ঢেউ তুলেছে- কত সংশয়, কত বিরোধ, কত পরিহাস, কত অস্বীকার, কত ঔদ্ধত্য ! সেখানে লোক কত কথাই বলে ; এ কোন দলের লোক, কোন সমাজের, এর কী ভাষা ! এ কী ভাবে, এর চরিত্রে কোথায় কী দরিদ্রতা আছে, তাই নিয়ে এত তর্ক ! এত প্রশ্ন এত বিরুদ্ধতার মাঝখানে কেমন করে নিয়ে যাব সেই প্ৰদীপখানি একটু বাতাস যার সয় না, সেই ফুলের অর্ঘ্য কেমন করে পৌঁছে দেব একটু সম্পর্শেই যা স্নান হয় । সেই শক্তি তো আমার নেই যার দ্বারা সমস্ত বিরুদ্ধতা নিরস্ত হবে, সব বিক্ষোভের তরঙ্গ শান্ত হবে । জনতার মাঝখানে যেখানে তীর উৎসব সেখানে আমি ভয় পাই, এত বিরুদ্ধতাকে ঠেলে চলতে আমি কুষ্ঠিত । বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের রাজরাজেশ্বর যেখানে তঁর সিংহাসনে আসীন সেখানে তার চরণে উপবেশন করতে আমি ভয় করি নি। সেখানে গিয়ে বলতে পারি, হে রাজন, তোমার সিংহাসনের এক পাশে আমায় স্থান দাও । তুমি তো কেবল বিশ্বের রাজা নও, আমার সঙ্গে যে তোমার অনন্ত কালের সম্বন্ধ। এ কথা বলতে কণ্ঠ কম্পিত হয় না, হৃদয় দ্বিধান্বিত হয় না । কিন্তু, ভিড়ের মধ্যে তোমাকে আমার বলে স্বীকার করতে কণ্ঠ যদি কম্পিত হয় তবে মাপ কোরো হে হৃদয়েশ্বর । ভিড়ের মধ্যে যখন ডাক দাও তখন কোন ভাষায় সাড়া দেব । তোমার চরণে হৃদয়ের যে ভাষা সে তো নীরব ভাষা, যে স্তবগান তোমার সে তো অশ্রুত গান । সে যে হৃদয়বীণার তন্ত্রে তন্ত্রে গুঞ্জিত হয়ে ওঠে, সেই বীণা যে তোমার বুকের কাছে তুমি ধরে রেখেছি। যতই ক্ষীণ সুরে সে বাজুক সে তোমার বুকের কাছেই বাজে । কিন্তু, তোমার আমার মাঝখানে যেখানে জনতার ব্যবধান, নীরবে হোক সরবে। হােক অন্তরে অস্তরে যেখানে কোলাহল তরঙ্গিত, সেই ব্যবধান ভেদ করে আমার এই ক্ষীণ কঠের সংগীত যে জগবে আমার পূজার দীপালোক যে অনির্বাণ হয়ে থাকবে- এ বড়ো কঠিন, বড়ো কঠিন । মানুষ গোড়াতেই যে প্রশ্ন করে, কে হে, তুমি কোন দলের । এ যে উৎসব- এ তো কোনো এক দল নয়, এ যে শতদল । এ কাদের উৎসব আমি কেমন করে তার নাম দেব । এক-একজন করে কত লোকের নাম বলব। হৃদয়ের ভক্তির প্রদীপ জ্বলিয়ে সমস্ত কোলাহল পার হয়ে স্তব্ধ শান্ত হয়ে যারা এসেছেন। আমি তো তাদের নাম জানি না। যারা যুগে যুগে এই উৎসবের দীপ জ্বালিয়ে গেছেন এবং যারা অনাগত যুগে এই দীপ জ্বালাবেন তাদের কত নাম করব। আর কেমন করেই বা করব । আমি এই জানি, যে সম্প্রদায় আপনার বাইরে আসতে চায় না। সে নিজের ছাপ মেরে তবে আত্মীয়তা করতে চায়। র্তার দক্ষিণ মুখের যে অস্নান জ্যোতি অনন্ত আকাশে প্ৰকাশমান, যে জ্যোতি মনুষ্যত্বের ইতিহাসের প্রবাহে ভাসমান, সম্প্রদায় সেই জ্যোতিকেই নিজের প্রাচীরের মধ্যে অবরুদ্ধ করতে চায় । উৎসব তো ভক্তির, উৎসব তো ভক্তেরই। সে তো মতের নয়, প্রথার নয়, অনুষ্ঠানের নয়। এ চিরদিনের উৎসব, এ লোকলোকান্তরের উৎসব । সেই অনন্ত কালের নিত্য-উৎসবের আলো থেকে যে একটুখানি স্মৃলিঙ্গ এখানে এসে পড়ছে। যদি কেউ হৃদয়ের দীপমুখে সেটুকু গ্ৰহণ করে তবেই সে শিখা জ্বলবে, তবেই উৎসব হবে। যদি তা না হয়, যদি কেবল দস্তুর রক্ষা করা হয়, এ যদি কেবল পঞ্জিকার জিনিস হয়, তবে সমস্ত অন্ধকার ; এখানে একটি দীপও তবে জ্বলে নি । সেইজন্য বলছি এ দলের উৎসব নয়, এ হৃদয়ের ভিতরকার ভক্তির উৎসব । আমরা লোক ডেকে আলো জ্বালাতে পারি, কিন্তু লোক ডেকে তো সুধারসের উৎসকে উৎসারিত করতে পারি না। যদি আজ কোনো জায়গায় ভক্তের কোনো একটি