পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২৩২ রবীন্দ্র-রচনাবলী এরূপ অবস্থায় যে বিচারে শশিভূষণ শাস্তি পাইলেন তাহাকে অন্যায় বলা যাইতে পারে না। তবে শাস্তিটা কিছু গুরুতর হইল। তিন-চারিট অভিযোগ, আঘাত, অনধিকার প্রবেশ, পুলিসের কর্তব্যে ব্যাঘাত ইত্যাদি, সব ক’টাই তাহার বিরুদ্ধে পুরা প্রমাণ হইল । শশিভূষণ র্তাহার সেই ক্ষুদ্র গৃহে তাহার প্রিয় পাঠ্যগ্রন্থগুলি ফেলিয়া পাচ বৎসর জেল খাটিতে গেলেন। তাহার বাপ আপিল করিতে উদ্যত হইলে তাহাকে শশিভূষণ বারংবার নিষেধ করিলেন ; কহিলেন, “জেল ভালো ! লোহার বেড়ি মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু জেলের বাহিরে যে স্বাধীনতা আছে সে আমাদিগকে প্রতারণা করিয়া বিপদে ফেলে। আর, যদি সংসঙ্গের কথা বল তো, জেলের মধ্যে মিথ্যাবাদী কৃতঘ্ন কাপুরুষের সংখ্যা অল্প, কারণ স্থান পরিমিত— বাহিরে অনেক বেশি ।” झश्य श्रद्विट्घ्छ्प्तः শশিভূষণের জেলে প্রবেশ করিবার অনতিকাল পরেই তাহার পিতার মৃত্যু হইল। র্তাহার আর বড়ো কেহ ছিল না । এক ভাই বহুকাল হইতে সেনট্রাল প্রভিন্সে কাজ করিতেন, দেশে আসা র্তাহার বড়ে ঘটিয়া উঠিত না, সেইখানেই তিনি বাড়ি তৈয়ারি করিয়া সপরিবারে স্থায়ী হইয়া বসিয়ছিলেন । দেশে বিষয়সম্পত্তি যাহা ছিল নায়েব হরকুমার তাহার অধিকাংশ নানা কৌশলে আত্মসাং করিলেন । জেলের মধ্যে অধিকাংশ কয়েদিকে যে পরিমাণে দুঃখ ভোগ করিতে হয় দৈববিপাকে শশিভূষণকে তদপেক্ষ অনেক বেশি সহ করিতে হইয়াছিল। তথাপি দীর্ঘ পাঁচ বৎসর কাটিয়া গেল । আবার একদা বর্ষার দিনে জীর্ণ শরীর ও শূন্ত হৃদয় লইয়া শশিভূষণ কারাপ্রাচীরের বাহিরে আসিয়া দাড়াইলেন । স্বাধীনতা পাইলেন, কিন্তু তাহা ছাড়া কারার বাহিরে র্তাহার আর-কেহ অথবা আর-কিছু ছিল না । গৃহহীন আত্মীয়হীন সমাজহীন কেবল র্তাহার একলাটির পক্ষে এত বড়ো জগৎ সংসার অত্যন্ত ঢিলা বলিয়া ঠেকিতে লাগিল । জীবনযাত্রার বিচ্ছিন্ন সূত্র আবার কোথা হইতে আরম্ভ করিবেন, এই কথা ভাবিতেছেন এমন সময়ে এক বৃহৎ জুড়ি তাহার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল। একজন ভৃত্য নামিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার নাম শশিভূষণবাবু ?” তিনি কহিলেন, “হ ।” সে তৎক্ষণাং গাড়ির দরজা খুলিয়া তাহার প্রবেশের প্রতীক্ষায় দাড়াইল । তিনি আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাকে কোথায় যাইতে হইবে।”