পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২৩৪ 曾 রবীন্দ্র-রচনাবলী আমার সর্বস্মরণে এসো, আমার সর্বভরমে এসো— আমার ধরম করম সোহাগ শরম জনম মরণে এসো ! গাড়ি যখন একটি প্রাচীরবেষ্টিত উদ্যানের মধ্যে প্রবেশ করিয়া একটি দ্বিতল অট্টালিকার সম্মুখে থামিল তখন শশিভূষণের গান থামিল। তিনি কোনো প্রশ্ন না করিয়া ভূত্যের নির্দেশক্রমে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিলেন । যে ঘরে আসিয়া বসিলেন সে ঘরের চারি দিকেই বড়ো বড়ো কাচের আলমারিতে বিচিত্র বর্ণের বিচিত্ৰ মলাটের সারি সারি বই সাজানো । সেই দৃপ্ত দেখিবামাত্র তাহার পুরাতন জীবন দ্বিতীয়বার কারামুক্ত হইয়া বাহির হইল। এই সোনার জলে অঙ্কিত নানা বর্ণে রঞ্জিত বইগুলি আনন্দলোকের মধ্যে প্রবেশ করিবার সুপরিচিত রত্নখচিত সিংহদ্বারের মতো তাহার নিকটে প্রতিভাত হইল । টেবিলের উপরেও কী কতকগুলি ছিল। শশিভূষণ র্তাহার ক্ষীণদৃষ্টি লইয়া ঝু কিয়া পড়িয়া দেখিলেন, একখানি বিদীর্ণ শ্লেট, তাহার উপরে গুটিকয়েক পুরাতন থাত, একখানি ছিন্নপ্রায় ধারাপাত, কথামালা এবং একখানি কাশীরামদাসের মহাভারত । শ্লেটের কাঠের ফ্রেমের উপর শশিভূষণের হস্তাক্ষরে কালি দিয়া খুব মোটা করিয়া লেখা— গিরিবালা দেবী । খাতা ও বইগুলির উপরেও ওই এক হস্তাক্ষরে এক নাম লিখিত । শশিভূষণ কোথায় আসিয়াছেন, বুঝিতে পারিলেন। তাহার বক্ষের মধ্যে রক্তস্রোত তরঙ্গিত হইয়া উঠিল। মুক্ত বাতায়ন দিয়া বাহিরে চাহিলেন— সেখানে কী চক্ষে পড়িল। সেই ক্ষুদ্র গরাদে-দেওয়া ঘর, সেই অসমতল গ্রাম্যপথ, সেই ডুরে-কাপড়-পরা ছোটো মেয়েটি । এবং সেই আপনার শাস্তিময় নিশ্চিন্ত নিভৃত জীবনযাত্রা । সেদিনকার সেই সুখের জীবন কিছুই অসামান্য বা অত্যধিক নহে ; দিনের পর দিন ক্ষুদ্র কাজে ক্ষুদ্র মুখে অজ্ঞাতসারে কাটিয়া যাইত, এবং তাহার নিজের অধ্যয়নকার্যের মধ্যে একটি বালিকা ছাত্রীর অধ্যাপনকার্য তুচ্ছ ঘটনার মধ্যেই গণ্য ছিল ; কিন্তু গ্রামপ্রাস্তের সেই নির্জন দিনযাপন, সেই ক্ষুদ্র শাস্তি, সেই ক্ষুদ্র সুখ, সেই ক্ষুদ্র বালিকার ক্ষুদ্র মুখখানি সমস্তই যেন স্বর্গের মতো দেশকালের বহির্ভূত এবং আয়ত্তের অতীতরূপে কেবল আকাঙ্ক্ষীরাজ্যের কল্পনাছায়ার মধ্যে বিরাজ করিতে লাগিল। সেদিনকার সেইসমস্ত ছবি এবং স্মৃতি আজিকার এই বর্ষামান প্রভাতের আলোকের সহিত এবং মনের মধ্যে মৃদুগুঞ্জিত সেই কীর্তনের গানের সহিত জড়িত মিশ্রিত হইয়া একপ্রকার সংগীতময় জ্যোতির্ময় অপূৰ্বরূপ ধারণ করিল। সেই জঙ্গলে বেষ্টিত কর্দমাক্ত সংকীর্ণ গ্রামপথের মধ্যে সেই অনাদৃত ব্যথিত বালিকার অভিমানমলিন মুখের শেষ স্মৃতিটি যেন বিধাতাবিরচিত