পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २8* চিরপরিচিতগণের প্রতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শাস্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে মৃতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়— তখনো যাহার বিশ্রামের জন্ত শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই । ক্ষীরোদা তাহার যৌবনের প্রান্তসীমায় যেদিন প্রাতঃকালে জাগিয়া উঠিয়া দেখিল তাহার প্রণয়ী পূর্বরাত্রে তাহার সমস্ত অলংকার ও অর্থ অপহরণ করিয়া পলায়ন করিয়াছে, বাড়িভাড়া দিবে এমন সঞ্চয় নাই— তিন বৎসরের শিশু পুত্রটিকে দুধ আনিয়া খাওয়াইবে এমন সংগতি নাই— যখন সে ভাবিয়া দেখিল, তাহার জীবনের আটত্রিশ বৎসরে সে একটি লোককেও আপনার করিতে পারে নাই, একটি ঘরের প্রাস্তেও বঁচিবার ও মরিবার অধিকার প্রাপ্ত হয় নাই ; যখন তাহার মনে পড়িল, আবার আজ অশ্ৰুজল মুছিয়া দুই চক্ষে অঞ্জন পরিতে হইবে, অধরে ও কপোলে অলক্তরাগ চিত্রিত করিতে হইবে, জীর্ণ যৌবনকে বিচিত্র ছলনায় আচ্ছন্ন করিয়া হাস্তমুখে অসীম ধৈর্য সহকারে নূতন হৃদয় হরণের জন্য নূতন মায়াপাশ বিস্তার করিতে হইবে ; তখন সে ঘরের দ্বার রুদ্ধ করিয়া ভূমিতে লুটাইয় বারংবার কঠিন মেঝের উপর মাথা খুড়িতে লাগিল— সমস্ত দিন অনাহারে মুমুধুর মতো পড়িয়া রহিল। সন্ধ্যা হইয়া আসিল । দীপহীন গৃহকোণে অন্ধকার ঘনীভূত হইতে লাগিল। দৈবক্রমে একজন পুরাতন প্রণয়ী আসিয়া ক্ষীরো ক্ষীরো’ শব্দে দ্বারে আঘাত করিতে লাগিল। ক্ষীরোদা অকস্মাং দ্বার খুলিয়া বাঁটাহস্তে বাঘিনীর মতো গর্জন করিয়া ছুটিয়া আসিল ; রসপিপাস্ত্র যুবকটি অনতিবিলম্বে পলায়নের পথ অবলম্বন করিল। ছেলেট ক্ষুধার জালায় কাদিয়া কাদিয়া থাটের নীচে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, সেই গোলমালে জাগিয়া উঠিয়া অন্ধকারের মধ্য হইতে ভগ্নকাতর কণ্ঠে মা মা’ করিয়া কাদিতে লাগিল । n 廳 তখন ক্ষীরোদা সেই রোরুদ্যমান শিশুকে প্রাণপণে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া বিদ্যুদবেগে ছুটিয়া নিকটবর্তী কুপের মধ্যে বর্ণপাইয়া পড়িল । শব্দ শুনিয়া আলো হন্তে প্রতিবেশীগণ কৃপের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল । ক্ষীরোদ এবং শিশুকে তুলিতে বিলম্ব হইল না। ক্ষীরোদা তখন অচেতন এবং শিশুটি মরিয়া গেছে। হাসপাতালে গিয়া ক্ষীরোদা আরোগ্য লাভ করিল। হত্যাপরাধে ম্যাজিস্ট্রেট তাহাকে সেসনে চালান করিয়া দিলেন ।