পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૬૭ রবীন্দ্র-রচনাবলী আমার প্রথমপক্ষের স্ত্রীর মতো এমন গৃহিণী অতি দুর্লভ ছিল। কিন্তু আমার তখন বয়ল বেশি ছিল না, সহজেই রসাধিক্য ছিল, তাহার উপর আবার কাব্যশাস্ত্রটা ভালো করিয়া অধ্যয়ন করিয়াছিলাম, তাই অবিমিশ্র গৃহিণীপণায় মন উঠিত না । কালিদাসের সেই শ্লোকটা প্রায় মনে উদয় হইত— গৃহিণী সচিবঃ সখী মিথ: প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধোঁ । কিন্তু আমার গৃহিণীর কাছে ললিত কলাবিধির কোনো উপদেশ খাটিত না এবং সখীভাবে প্রণয়সম্ভাষণ করিতে গেলে তিনি হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন। গঙ্গার স্রোতে যেমন ইন্দ্রের ঐরাবত নাকাল হইয়াছিল তেমনি তাহার হাসির মুখে বড়ে বড়ো কাব্যের টুকরা এবং ভালো ভালো আদরের সম্ভাষণ মুহূর্তের মধ্যে অপদস্থ হইয়া ভাসিয়া বাইত। তাহার হাসিবার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। তাহার পর, আজ বছর চারেক হইল আমাকে সাংঘাতিক রোগে ধরিল । ওষ্ঠত্রণ হইয়া জরবিকার হইয়া, মরিবার দাখিল হইলাম। বঁচিবার আশা ছিল না। একদিন এমন হইল যে, ডাক্তারে জবাব দিয়া গেল। এমন সময় আমার এক আত্মীয় কোথা হইতে এক ব্রহ্মচারী আনিয়া উপস্থিত করিল ; সে গব্য বৃতের সহিত একটা শিকড় বঁটিয়া আমাকে খাওয়াইয়া দিল। ঔষধের গুণেই হউক বা অদৃষ্টক্রমেই হউক সে-যাত্র বঁচিয়া গেলাম। রোগের সময় আমার স্ত্রী অহৰ্নিশি এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম করেন নাই। সেই কটা দিন একটি অবলা স্ত্রীলোক, মানুষের সামান্য শক্তি লইয়া প্রাণপণ ব্যাকুলতার সহিত, দ্বারে সমাগত যমদূতগুলার সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তাহার সমস্ত প্রেম, সমস্ত হৃদয়, সমস্ত যত্ব দিয়া আমার এই অযোগ্য প্রাণটাকে যেন বক্ষের শিশুর মতো দুই হস্তে ঝাপিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছিলেন । আহার ছিল না, নিদ্রা ছিল না, জগতের আর-কোনো-কিছুর প্রতিই দৃষ্টি ছিল না। যম তখন পরাহত ব্যান্ত্রের ন্যায় আমাকে তাহার কবল হইতে ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন, কিন্তু, যাইবার সময় আমার স্ত্রীকে একটা প্রবল থাবা মারিয়া গেলেন । আমার স্ত্রী তখন গর্ভবতী ছিলেন, অনতিকাল পরে এক মৃত সস্তান প্রসব করিলেন। তাহার পর হইতেই তাহার নানাপ্রকার জটিল ব্যামোর সূত্রপাত হইল । তখন আমি তাহার সেবা আরম্ভ করিয়া দিলাম। তাহাতে তিনি বিত্রত হইয়া উঠিলেন। বলিতে লাগিলেন, “আম, করে কী ! লোকে বলিবে কী ! অমন করিয়া দিনরাত্ৰি তুমি আমার ঘরে যাতায়াত করিয়ে না।”