পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৭৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী وانا جن করিয়া হাতে হাতে ধরিয়া গম্যহীন পথে উদেশ্বহীন ভ্রমণে চন্দ্রালোকিত শূন্ততার উপর দিয়া অবারিত ভাবে চলিয়া যাইব । এইরূপে চলিতে চলিতে এক জায়গায় আসিয়া দেখিলাম, সেই বালুকারাশির মাঝখানে অদূরে একটি জলাশয়ের মতো হইয়াছে— পদ্মা সরিয়া যাওয়ার পর সেইখানে জল বাধিয়া আছে । . সেই মরুবালুকাবেষ্টিত নিস্তরঙ্গ নিযুপ্ত নিশ্চল জলটুকুর উপরে একটি সুদীর্ঘ জ্যোৎস্নার রেখা মূছিতভাবে পড়িয়া আছে। সেই জায়গাটাতে আসিয়া আমরা দুই জনে দাড়াইলাম— মনোরমা কী ভাবিয়া আমার মুখের দিকে চাহিল, তাহার মাথার উপর হইতে শালটা হঠাৎ খসিয়া পড়িল । আমি তাহার সেই জ্যোৎস্নাবিকশিত মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া চুম্বন করিলাম। সেইসময় সেই জনমানবশূন্ত নিঃসঙ্গ মরুভূমির মধ্যে গম্ভীরস্বরে কে তিনবার বলিয়া উঠিল, “ও কে ? ও কে ? ও কে ?” আমি চমকিয়া উঠিলাম, আমার স্ত্রীও র্কাপিয়া উঠিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আমরা দুই জনেই বুঝিলাম, এই শব্দ মাতুষিক নহে, অমানুষিকও নহে— চরবিহারী জলচর পাখির ডাক। হঠাৎ এত রাত্রে তাহদের নিরাপদ নিভৃত নিবাসের কাছে লোকসমাগম দেখিয়া চকিত হইয়া উঠিয়াছে। সেই ভয়ের চমক খাইয়া আমরা দুই জনেই তাড়াতাড়ি বোটে ফিরিলাম। রাত্রে বিছানায় আসিয়া শুইলাম ; শ্রাস্তশরীরে মনোরমা অবিলম্বে ঘুমাইয়া পড়িল। তখন অন্ধকারে কে একজন আমার মশারির কাছে দাড়াইয়া স্বযুপ্ত মনোরমার দিকে একটিমাত্র দীর্ঘ শীর্ণ অস্থিসার অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া যেন আমার কানে কানে অত্যন্ত চুপিচুপি অক্ষুটকণ্ঠে কেবলই জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, “ও কে ? ও কে ? ও কে গো ?” তাড়াতাড়ি উঠিয়া দেশালাই জালাইয়া বাতি ধরাইলাম। সেই মুহূর্তেই ছায়ামূর্তি মিলাইয়া গিয়া, আমার মশারি র্কাপাইয়া, বোট দুলাইয়া, আমার সমস্ত ঘৰ্মাক্ত শরীরের রক্ত হিম করিয়া দিয়া হাহা—হাহা—হাহা করিয়া একটা হালি অন্ধকার রাত্রির ভিতর দিয়া বহিয়া চলিয়া গেল। পদ্মা পার হইল, পদ্মার চর পার হইল, তাহার পরবর্তী সমস্ত সুপ্ত দেশ গ্রাম নগর পার হইয়া গেল— যেন তাহা চিরকাল ধরিয়া দেশদেশাস্তর লোকলোকাস্তর পার হইয়া ক্রমশ ক্ষীণ ক্ষীণতর ক্ষীণতম হইয়া অসীম স্বৰূরে চলিয়া যাইতেছে ; ক্রমে যেন তাহা জন্মমৃত্যুর দেশ ছাড়াইয়া গেল , ক্রমে তাহ যেন সূচির অগ্রভাগের ন্যায় ক্ষীণতম হইয়া আসিল , এত ক্ষীণ শব্দ কখনো শুনি নাই, কল্পনা করি নাই ; আমার মাথার মধ্যে যেন অনন্ত আকাশ রহিয়াছে এবং সেই শৰ যতই দূরে