পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৭৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২৭১ বয়সের অপেক্ষ মুখ অনেক পাকিয়াছে বলিতে হইবে, যদি সতেরো আঠারো হয় তবে বয়সের অনুরূপ পাক ধরে নাই। হয় সে অকালপক্ব, নয় সে অকাল-অপক । আসল কথা এই, সে অতি অল্প বয়সেই যাত্রার ফলে ঢুকিয়া রাধিকা, দময়ন্তী, সীত এবং বিদ্যার সর্থী সাজিত। অধিকারীর আবশ্যকমতো বিধাতার বরে খানিক দূর পর্যস্ত বাড়িয়া তাহার বাড় থামিয়া গেল। তাহাকে সকলে ছোটোই দেখিত, আপনাকেও সে ছোটোই জ্ঞান করিত, বয়সের উপযুক্ত সম্মান সে কাহারো কাছে পাইত না । এই সকল স্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিক কারণ-প্রভাবে সতেরো বৎসর বয়সের সময় তাহাকে অনতিপক সতেরোর অপেক্ষা অতিপরিপক্ক চোদর মতো দেখাইত। গোফের রেখা না উঠাতে এই ভ্রম আরো দৃঢ়মূল হইয়াছিল। তামাকের ধোয়া লাগিয়াই হউক, বা বয়সামুচিত ভাষা প্রয়োগবশতই হউক, নীলকাস্তের ঠোটের কাছটা কিছু বেশি পাকা বোধ হইত, কিন্তু তাহার বৃহৎ তারাবিশিষ্ট দুইটি চক্ষের মধ্যে একটা সারল্য এবং তারুণ্য ছিল । অনুমান করি, নীলকাস্তের ভিতরটা স্বভাবত কাচা, কিন্তু যাত্রার দলের তা’ লাগিয়া উপরিভাগে পক্কতার লক্ষণ দেখা দিয়াছে । শরংবাবুর আশ্রয়ে চন্দননগরের বাগানে বাস করিতে করিতে নীলকাস্তের উপর স্বভাবের নিয়ম অব্যাহতভাবে আপন কাজ করিতে লাগিল। সে এতদিন যে একটা বয়ঃসন্ধিস্থলে অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘকাল থামিয়া ছিল এখানে আসিয়া সেটা কখন একসময় নিঃশব্দে পার হইয়া গেল। তাহার সতেরো-আঠারো বৎসরের বয়ঃক্রম বেশ সম্পূর্ণভাবে পরিণত হইয়া উঠিল। তাহার সে পরিবর্তন বাহির হইতে কাহারে চোখে পড়িল না কিন্তু তাহার প্রথম লক্ষণ এই যে, যখন কিরণ নীলকাস্তের প্রতি বালকযোগ্য ব্যবহার করিতেন সে মনে মনে লজ্জিত এবং ব্যথিত হইত। একদিন আমোদপ্রিয় কিরণ তাহাকে স্ত্রীবেশে সর্থী সাজিবার কথা বলিয়াছিলেন, সে-কথাটা অকস্মাৎ তাহার বড়োই কষ্টদায়ক লাগিল অথচ তাহার উপযুক্ত কারণ খুজিয়া পাইল না। আজকাল তাহাকে যাত্রার অনুকরণ করিতে ডাকিলেই সে অদৃপ্ত হইয়া যাইত। সে যে একটা লক্ষ্মীছাড়া যাত্রার দলের ছোকরার অপেক্ষ অধিক কিছু নয় এ কথা কিছুতে তাহার মনে লইত না । এমন-কি, সে বাড়ির সরকারের নিকট কিছু কিছু করিয়া লেখাপড়া শিখিবার সংকল্প করিল। কিন্তু বউঠাকরুনের স্নেহভাজন বলিয়া নীলকান্তকে সরকার দুই চক্ষে দেখিতে পারিত না, এবং মনের একাগ্রত রক্ষা করিয়া পড়াশুনা কোনোকালে অভ্যাস না থাকাতে অক্ষরগুলো তাহার চোখের সামনে দিয়া ভাসিয়া যাইত। গঙ্গার ধারে চাপাতলায় গাছের গুড়িতে ঠেসান দিয়া কোলের উপর বই খুলিয়া সে দীর্ঘকাল বসিয়া