পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩২৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জাপানযাত্রী ల లి ক্রমাগত নতুন নতুন রঙে সরস হয়ে আসছে, আলো ক্ষণে ক্ষণে নতুন নতুন স্বাদে আকাশকে এবং জলকে পূর্ণ করে তুলছে। আমরা দিনরাত পৃথিবীর কোলে কাখে থাকি বলেই আকাশের দিকে তাকাই নে, আকাশের দিগবসনকে বলি উলঙ্গতা। যখন দীর্ঘকাল ওই আকাশের সঙ্গে মুখোমুখি করে থাকতে হয়, তখন তার পরিচয়ের বিচিত্রতায় অবাক হয়ে থাকি । ওখানে মেঘে মেঘে রূপের এবং রঙের অহেতুক বিকাশ। এ যেন গানের আলাপের মতে, রূপ-রঙের রাগরাগিণীর আলাপ চলছে— তাল নেই, আকার-আয়তনের বঁাধার্বাধি নেই, কোনো অর্থবিশিষ্ট বাণী নেই, কেবলমাত্র মুক্ত স্বরের লীলা । সেইসঙ্গে সমুদ্রের অপােরন্থত্য ও মুক্ত ছন্দের নাচ । তার মৃদঙ্গে যে বোল বাজছে তার ছন্দ এমন বিপুল যে, তার লয় খুজে পাওয়া যায় না । তাতে নৃত্যের উল্লাস আছে, অথচ নৃত্যের নিয়ম নেই। এই বিরাট রঙ্গশালায় আকাশ এবং সমুত্রের যে-রঙ্গ সেইটি দেখবার শক্তি ক্রমে আমাদের বেড়ে ওঠে। জগতে যা-কিছু মহান, তার চারি দিকে একটা বিরলতা আছে, তার পটভূমিকা ( background ) সাদাসিধে । সে আপনাকে দেখাবার জন্যে আর কিছুর সাহায্য নিতে চায় না। নিশীথের নক্ষত্রসভা অসীম অন্ধকারের অবকাশের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে। এই সমুদ্র-আকাশের যে বৃহৎ প্রকাশ সেও বহু-উপকরণের দ্বারা আপন মর্যাদা নষ্ট করে না । এরা হল জগতের বড়ো ওস্তাদ, ছলাকলায় আমাদের মন ভোলাতে এর অবজ্ঞা করে। মনকে শ্রদ্ধাপূর্বক আপন হতে অগ্রসর হয়ে এদের কাছে যেতে হয়। মন যখন নানা ভোগে জীৰ্ণ হয়ে অলস এবং ‘অন্যথাবৃত্তি’ হয়ে থাকে তখন এই ওস্তাদের আলাপ তার পক্ষে অত্যন্ত ফাকা । আমাদের স্ববিধে হয়েছে, সামনে আমাদের আর কিছু নেই। অন্তবারে যখন বিলিতি যাত্রী-জাহাজে সমূদ্র পাড়ি দিয়েছি তখন যাত্রীরাই ছিল এক দৃশ্য। তারা নাচে গানে খেলায় গোলেমালে অনন্তকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এক মুহূর্তও তারা ফাকা ফেলে রাখতে চাইত না । তার উপরে সাজসজ্জা, কায়দাকাকুনের উপসর্গ ছিল। এখানে জাহাজের ডেকের সঙ্গে সমুদ্র-আকাশের কোনো প্রতিযোগিতা নেই। যাত্রীর সংখ্যা অতি সামান্ত, আমরাই চারজন ; বাকি দু-তিনজন ধীর প্রকৃতির লোক। তার পরে, টিলাঢ়ালা বেশেই ঘুমচ্চি, জাগছি, খেতে যাচ্ছি, কারো কোনো আপত্তি নেই ; তার প্রধান কারণ, এমন কোনো মহিলা নেই আমাদের অপরিচ্ছন্নতায় র্যার অসম্রম হতে পারে । so এইজন্তেই প্রতিদিন আমরা বুঝতে পারছি, জগতে স্বর্যোদয় ও স্বর্যাস্ত সামান্ত ব্যাপার নয়, তার অভ্যর্থনার জন্যে স্বর্গে মর্তে রাজকীয় সমারোহ। প্রভাতে পৃথিবী