পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী سرلیCNا করতে থাকে যে, “তোমাদের বীণা, তোমাদের মৃদঙ্গও আমাদের জয়যাত্রার ব্যাণ্ডের সঙ্গে মিলে আমাদের কল্লোলকে ঘনীভূত করে তুলুক।” সেজন্যে সে খুব বড়ো মজুরি আর জাকালো শিরোপা দিতেও রাজি আছে । আগেকার রাজসভার চেয়ে সে হাকও দেয় বেশি দামও দেয় বেশি। সেইজন্যে ঢাকির পক্ষে এ সময়ট স্বসময়, কিন্তু বীণকারের পক্ষে নয় । ওস্তাদ হাত জোড় করে বলে, “তোমাদের হটগোলের কাজে আমার স্থান নেই ; অতএব বরঞ্চ আমি চুপ করে থাকতে রাজি আছি, বীণাটা গলায় বেঁধে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মরতেও রাজি আছি, কিন্তু আমাকে তোমাদের সদররাস্তায় গড়ের বাস্থ্যের দলে ডেকো না । কেননা, আমার উপরওয়ালার কাছ থেকে তার গানের আসরের জন্তে পূর্ব হতেই বায়না পেয়ে বসে আছি।” এতে জনসাধারণ নানাপ্রকার কটু সম্ভাষণ করে, সে বলে, “তুমি লোকহিত মান না, দেশহিত মান না, কেবল আপন খেয়ালকেই মান ।” বীণকার বলতে চেষ্টা করে, “আমি আমার খেয়ালকেও মানি নে, তোমার গরজকেও মানি নে, আমার উপরওয়ালাকে মানি।” সহস্ররসনাধারী গর্জন করে বলে ওঠে, "চুপ!” জনসাধারণ বলতে যে প্রকাগু জীবকে বোঝায় স্বভাবতই তার প্রয়োজন প্রবল এবং প্রভূত । এইজন্যে স্বভাবতই প্রয়োজনসাধনের দাম তার কাছে অনেক বেশি, লীলাকে সে অবজ্ঞা করে। ক্ষুধার সময়ে বকুলের চেয়ে বার্তাকুর দাম বেশি হয়। সেজন্যে ক্ষুধাতুরকে দোষ দিই নে ; কিন্তু বকুলকে যখন বার্তাকুর পদ গ্রহণ করবার জন্যে করমাশ আসে তখন সেই ফরমাশকেই দোষ দিই। বিধাতা ক্ষুধাতুরের দেশেও বকুল ফুটিয়েছেন, এতে বকুলের কোনো হাত নেই। তার একটিমাত্র দায়িত্ব আছে এই যে, যেখানে যা-ই ঘটুক, তাকে কারো দরকার থাকৃ বা না থাক, তাকে বকুল হয়ে উঠতেই হবে ; ঝরে পড়ে তো পড়বে, মালায় গাথা হয়তো তা-ই সই। এই কথাটাকেই গীতা বলেছেন, “স্বধর্মে নিধনং শ্ৰেয়ঃ পরধর্মে ভয়াবহ ।” দেখা গেছে, স্বধর্মে জগতে খুব মহৎ লোকেরও নিধন হয়েছে, কিন্তু সে নিধন বাইরের, স্বধৰ্ম ভিতরের দিক থেকে তাকে বাচিয়েছে। আর এও দেখা গেছে, পরধর্মে খুব ক্ষুদ্র লোকেও হঠাৎ বড়ো হয়ে উঠেছে, কিন্তু তার নিধন ভিতরের থেকে, যাকে উপনিষদ বলেন “মহতী বিনষ্টিঃ” । ষে-ব্যক্তি ছোটো তারও স্বধৰ্ম বলে একটি সম্পদ আছে। তার সেই ছোটো কোঁটোটির মধ্যেই সেই স্বধর্মের সম্পদটিকে রক্ষা করে সে পরিত্রাণ পায়। ইতিহাসে তার নাম থাকে না, হয়তো তার বদনাম থাকতেও পারে, কিন্তু তার অন্তর্যামীর খাসদরবারে তার নাম থেকে যায়। লোভে পড়ে স্বধর্ম বিকিয়ে দিয়ে সে যদি পরধর্মের