পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী \Oly-C) মনে আছে, ছেলেবেলায় আমাদের তেতালার ছাদের সংকীর্ণ কানিসটার উপর দিয়ে চলে যাওয়াটাকে উচুদরের খেলা বলে মনে করতুম। ভয় করত না বলে নয়, ভয় করত বলেই। ভয় নামক প্রাণের পাহারাওয়ালাটা ঠিক সেই মোড়ের মাথায় দেখা দিত বলেই তাকে ব্যঙ্গ করাটা মজা বলে মনে হত । পুরুষের মধ্যে এই ষে কাগুটা হয়, এ সমস্তই মনের চক্রাস্তে। সে বলে, “প্রাণের সঙ্গে আমার নন-কো-অপারেশন যতই পাকা হবে ততই আমার মুক্তি হবে সহজ।” কেন রে বাপু, প্রাণ তোমার কী অপরাধটা করেছে, আর এই মুক্তি নিয়েই বা করবে কী। মন বলে, “আমি অশেষের রাজ্যে সন্ধান করতে বেরব, আমি দুঃসাধ্যের সাধনা করব, দুৰ্গমের বাধা কাটিয়ে দিয়ে দুর্লভকে উদ্ধার করে আনব। আমি একটু নড়ে বসতে গেলেই যে-দুঃশাসন নানারকম ভয় দেখিয়ে আমাকে পিছমোড়া করে বাধতে আসে তাকে আমি সম্পূর্ণ হার মানব তবে ছাড়ব ।” তাই পুরুষ তপস্বী বলে বসে, “ন খেয়েই বা বাচা যাবে না কেন । নিশ্বাস বন্ধ করলেই যে মরতে হবে, এমন কী কথা আছে।” শুধু তাই নয়, এর চেয়েও শক্ত কথা বলে ; বলে, “মেয়েদের মুখ দেখব না। তারা প্রকৃতির গুপ্তচর, প্রাণরাজত্বের যতসব দাস সংগ্রহ করবার তারাই আড়কাঠি ।” যে সব পুরুষ তপস্বী নয় শুনে তারাও বলে, “বাহবা ।” প্রকৃতিস্থ অবস্থায় সাধারণত কোনো মেয়ের দল বলে না, পুরুষকে সম্পূর্ণ বর্জন করাটাই তাদের জীবনের চরম এবং মহোচ্চ লক্ষ্য । সম্প্রতি কোথাও কোথাও কখনো এমন কথার আভাস শোনা যায়, কিন্তু সেটা হল আস্ফালন । প্রাণের রাজ্যে মেয়েদের যে চিরকেলে স্থান আছে সেখানকার বন্দরের নোঙর ছিড়ে মনটাকে নিয়ে তারা নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, এমন কথা দুই-একজন মেয়ে বলতেও পারে ; কারণ, যাত্রারম্ভে ভাগ্যদেবতা যখন জীবনের সম্বল স্ত্রীপুরুষের মধ্যে বাটোয়ারা করে দেয় তখন প্যাক করবার সময় কিছু ষে উলটোপালটা হয় না, তা নয়। আসল কথা হচ্ছে, প্রকৃতির ব্যবস্থায় মেয়ের একটা জায়গা পাকা করে পেয়েছে, পুরুষরা তা পায় নি। পুরুষকে চিরদিন জায়গা খুজতে হবে। খুজতে খুজতে সে কত নতুনেরই সন্ধান পাচ্ছে কিন্তু চরমের আহবান তাকে থামতে দিচ্ছে না, বলছে, *আরো এগিয়ে এসো।” একজায়গায় এসে ষে পৌচেছে তার একরকমের আয়োজন, আর যাকে চলতে হবে তার আর-একরকমের । এ তো হওয়াই চাই। স্থিতি যে পেয়েছে বসে বসে ক্রমে ক্রমে চারি দিকের সঙ্গে আপন সম্বন্ধকে সে সত্য করতে, পূর্ণ করতে চেষ্টা করে। কেননা, সম্বন্ধ সত্য হলে তবেই তার মধ্যে মুক্তি পাওয়া যায়। যার সঙ্গে ঘর করতে