পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী webዎ® স্বঠক্ষেত্র হতে পারে শূন্তে, কিন্তু বিষ্ণুর শক্তি খাটে লোকজগতে। নারী সেই বিষ্ণুর শক্তি, তার স্বটিতে ব্যক্তিবিশেষের প্রাধান্ত ; ব্যক্তিবিশেষের তুচ্ছতাও প্রেমের কাছে মূল্যবান । ব্যক্তিবিশেষের ছোটোবড়ো বিচিত্র দাবির সমস্ত খুটিনাটিতে সেই প্রেমের আত্মদানশক্তি নিজেকে বহুধারায় উন্মুক্ত করে। ব্যক্তিবিশেষের সেই নানা ক্ষুধার নানা চাওয়া মেয়ের প্রেমের উদ্যমকে কেবলই জাগিয়ে রেখে দেয়। যে পুরুষ আপন দাবিকে ছোটো করে সে খুব ভালো লোক হতে পারে, কিন্তু মেয়েকে সে পীড়া দেয়, অপূর্ণ করে রাখে। এই জন্তে দেখা যায়, যে পুরুষ দৌরাত্ম্য করে বেশি মেয়ের ভালোবাসা সেই পায় বেশি। নারীর প্রেম যে পুরুষকে চায় তাকে প্রত্যক্ষ চায়, তাকে নিরস্তর নানা আকারে বেষ্টন করবার জন্যে সে ব্যাকুল। মাঝখানে ব্যবধানের শূন্যতাকে সে সইতে পারে না । মেয়েরাই যথার্থ অভিসারিকা। যেমন করেই হোক, যত দুর্গমই হোক, বিচ্ছেদ পার হবার জন্য তাদের সমস্ত প্রাণ ছটফট করতে থাকে। এই জন্যেই সাধনারত পুরুষ মেয়ের এই নিবিড় সঙ্গবন্ধনের টান এড়িয়ে অতি নিরাপদ দূরত্বের মধ্যে পালাতে ইচ্ছা করে। পূর্বেই বলেছি, আপন পূর্ণতার জন্যে প্রেম ব্যক্তিবিশেষকে চায়। এই ব্যক্তিবিশেষ জিনিসটি অত্যন্ত বাস্তব জিনিস। তাকে পেতে গেলে তার সমস্ত তুচ্ছ খুটিনাটির কোনোটাকে বাদ দেওয়া চলে না, তার দোষ ক্রটিকেও মেনে নিতে হয়। ব্যক্তিরূপের উপর ভাবের আবরণ টেনে দিয়ে তাকে অপরূপ করে তোলা প্রেমের পক্ষে অনাবশু্যক । অভাবকে অসম্পূর্ণতাকে প্রেম কামনা করে, নইলে তার নিজের সম্পূর্ণতা সফল হবে কিসে। দেবতার মনের ভাব ঠিকমতো জানি বলে অভিমান রাখি নে কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কাতিকের চেয়ে গণেশের পরে দুর্গার স্নেহ বেশি । এমন-কি, লম্বোদরের অতি অযোগ্য ক্ষুদ্র বাহনটার পরে কাতিকের খোশপোশাকি ময়ুর লোভদৃষ্টি দেয় বলে তার পেখমের অপরূপ সৌন্দর্য সত্ত্বেও তার উপরে তিনি বিরক্ত ; ওই দীনাত্মা ইদুরটা যখন র্তার ভাণ্ডারে ঢুকে র্তার ভাড়গুলোর গায়ে সিদ্ধ কাটতে থাকে তখন হেসে তিনি তাকে ক্ষমা করেন। শাস্ত্রনীতিজ্ঞ পুরুষবর নন্দী বলে, “মা, তুমি ওকে শাসন কর না, ও বড়ো প্রশ্ৰয় পাচ্ছে।” দেবী স্নিগ্ধকণ্ঠে বলেন, “আহা, চুরি করে খাওয়াই যে ওর স্বধৰ্ম, তা ওর দোষ কী ! ও যে চোরের দাত নিয়েই জন্মেছে, সে কি বৃথা হবে।” বাক্যের অপূর্ণতাকে সংগীত যেমন আপন রসে পূর্ণ করে তোলে, প্রেম তেমনি স্থযোগ্যতার অপেক্ষা করে না, অযোগ্যতার ফাকের মধ্যে সে নিজেকে ঢেলে দেবার স্থযোগ পায়। মেয়েদের স্বাক্টর আলো যেমন এই প্রেম তেমনি পুরুষের স্বাক্টর আলো কল্পনাবৃত্তি।