পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৩৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী * 884 ধর্ম নেই, তাই তাকে প্রবল হতে দিলেই আভরণ হয়ে ওঠে শৃঙ্খল ; তখন সে আর্টের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বন্ধ করে দেয়, তার গতি রোধ করে। তখন যেটা বাহাদুরি করতে থাকে সেটা আত্মিক নয়, সেটা বৈষয়িক ; অর্থাৎ, তার মধ্যে প্রাণগত বৃদ্ধি নেই, বভাগত সঞ্চয় আছে। তাই আমাদের হিন্দুস্থানি গানে বৃদ্ধি দেখতে পাই নে। তানসেন প্রভৃতির অক্ষয় কমণ্ডলু থেকে যে-ধারা প্রবাহিত হয়েছিল ওস্তাদ প্রভৃতি জহুমুনি কারদানি দিয়ে সেটি গিলে খেয়ে বসে আছে । মোট কথা, সত্যের রসরূপটি স্বন্দর ও সরল করে প্রকাশ করা ষে-কলাবিদ্যার কাজ অবাস্তরের জঞ্জাল তার সবচেয়ে শক্র । মহারণ্যের শ্বাস রুদ্ধ করে দেয় মহাজঙ্গল । আধুনিক কলারসজ্ঞ বলছেন, আদিকালের মানুষ তার অশিক্ষিতপটুত্বে বিরলরেখায় যে-রকম সাদাসিধে ছবি অঁাকত, ছবির সেই গোড়াকার ছাদের মধ্যে ফিরে না গেলে এই অবাস্তরভারপীড়িত আর্টের উদ্ধার নেই। মানুষ বারবার শিশু হয়ে জন্মায় বলেই সত্যের সংস্কারবজিত সরলরূপের আদর্শ চিরন্তন হয়ে আছে ; আর্টকেও তেমনি শিশুজন্ম নিয়ে অতি-অলংকারের বন্ধনপাশ থেকে বারে বারে মুক্তি পেতে হবে। এই অবাস্তরবর্জন কি শুধু আর্টেরই পরিত্রাণ। আজকের দিনের ভারজর্জর সভ্যতারও এই পথে মুক্তি। মুক্তি যে সংগ্রহের বাহুল্যে নয়, ভোগের প্রাচুর্যে নয়, মুক্তি ষে আত্মপ্রকাশের সত্যতায়, আজকের দিনে এই কথাই মানুষকে বারবার স্মরণ করাতে হবে । কেননা, আজ মামুষ যেরকম বন্ধনজালে জড়িত, এমন কোনো দিনই ছিল না । লোভমোহের বন্ধন থেকে মানুষ কবেই বা মুক্ত ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তির সাধনা ছিল সজাগ । বৈষয়িকতার বেড়ায় তখন ফাক ছিল ; সেই ফাকের ভিতর দিয়ে সত্যের আলো আসত বলে সেই আলোর প্রতি কোনো দিন বিশ্বাস যায় নি। আজ জটিল অবাস্তরকে অতিক্রম করে সরল চিরন্তনকে অস্তরের সঙ্গে স্বীকার করবার সাহস মাজুযের চলে গেছে । জাজ কত পণ্ডিত তথ্যের গভীর অন্ধকূপে ঢুকে টুকরো-টুকরো সংবাদের কণা খুটে খুটে জমাচ্ছেন। রোপে যখন বিদ্বেষের কলুষে আকাশ আবিল তখন এই সকল পণ্ডিতদেরও মন দেখি বিষাক্ত। সত্যসাধনার যে-উজার বৈরাগ্য ক্ষুদ্রতা থেকে ভেদবুদ্ধি থেকে মানুষকে বাচিয়ে রাখে, তারা তার আহবান শুনতে পান নি। তার প্রধান কারণ, জ্ঞানসাধনায় উপরের দিকে খাড়া হয়ে মাছুবের ষে-মাথা একদিন বিশ্ব-দেখা দেখত আজ সেই মাথা নীচে ঝুকে পড়ে দিনরাত টুকরো-দেখা দেখছে । o ভারতের মধ্যযুগে যখন কবীর দাদু প্রভৃতি সাধুদের আবির্ভাব হয়েছিল তখন