পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী 8br☾ আপ্যায়ন সেরে আমাদের নিমন্ত্রণকর্তা রাজার সঙ্গে তার মোটরগাড়িতে চড়ে আবার স্বদীর্ঘপথ ভেঙে চললুম তার প্রাসাদে। প্রাসাদকে এরা পুরী বলে। রাজার ভাষা আমি জানি নে, আমার ভাষা রাজা বোঝেন না— বোঝবার লোকও কেউ সঙ্গে নেই। চুপ করে গাড়ির জানাল দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলুম। মস্ত স্থবিধে এই, এখানকার প্রকৃতি বালিনি ভাষায় কথা কয় না ; সেই খামার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখি আর অরসিক মোটরগাড়িটাকে মনে মনে অভিশাপ দিই । মনে পড়ল, কখনো কখনো শুষ্কচিত্ত গাইয়ের মুখে গান শুনেছি ; রাগিণীর যেটা বিশেষ দরদের জায়গা, যেখানে মন প্রত্যাশা করছে, গাইয়ের কণ্ঠ অত্যুচ্চ আকাশের চিলের মতো পাখাটা ছড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ স্থির থাকবে কিম্বা দুই-একটা মাত্র মীড়ের ঝাপট দেবে, গানের সেই মর্মস্থানের উপর দিয়ে যখন সেই সংগীতের পালোয়ান তার তানগুলোকে লোটন-পায়রার মতো পালটিয়ে পালটিয়ে উড়িয়ে চলেছে, তখন কিরকম বিরক্ত হয়েছি। পথের দুই ধারে গিরি অরণ্য সমুদ্র, আর সুন্দর সব ছায়াবেষ্টিত লোকালয়, কিন্তু মোটরগাড়িটা দুন-চৌদুন মাত্রায় চাকা চালিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলেছে, কোনো-কিছুর পরে তার কিছুমাত্র দরদ নেই ; মনটা ক্ষণে ক্ষণে বলে উঠছে, “আরে, রোসে৷ রোসো, দেখে নিই।” কিন্তু, এই কল-দৈত্য মনটাকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় ; তার একমাত্র ধুয়ো, “সময় নেই, সময় নেই।” এক জায়গায় যেখানে বনের ফাকের ভিতর দিয়ে নীল সমুদ্র দেখা গেল রাজা আমাদের ভাষাতেই বলে উঠলেন “সমুদ্র” ; আমাকে বিস্মিত ও আনন্দিত হতে দেখে আউড়ে গেলেন, “সমুদ্র, সাগর, অন্ধি, জলাঢ্য ।” তার পরে বললেন, “সপ্তসমুদ্র, সপ্তপর্বত, সপ্তবন, সপ্তআকাশ ।” তার পরে পর্বতের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন “অন্দ্রি” ; তার পরে বলে গেলেন, “স্বমেরু, হিমালয়, বিন্ধ্য, মলয়, ঋষ্যমূক।” এক জায়গায় পাহাড়ের তলায় ছোটো নদী বয়ে যাচ্ছিল, রাজা আউড়িয়ে গেলেন, “গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা, গোদাবরী, কাবেরী, সরস্বতী।” আমাদের ইতিহাসে একদিন ভারতবর্ষ আপন ভৌগোলিক সত্তাকে বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিল ; তখন সে আপনার নদীপৰ্বতের ধ্যানের দ্বারা আপন ভূমূর্তিকে মনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিল। তার তীর্থগুলি এমন করে বাধা হয়েছে— দক্ষিণে কন্যাকুমারী, উত্তরে মানসসরোবর, পশ্চিমসমুদ্রতীরে দ্বারকা, পূর্বসমূত্রে গঙ্গাসংগম— ষাতে করে তীর্থভ্রমণের দ্বারা ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ রূপটিকে ভক্তির সঙ্গে মনের মধ্যে গভীরভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। ভারতবর্ষকে চেনবার এমন উপায় আর কিছু হতে পারে না। তখন পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করতে হত স্থতরাং তীর্থভ্রমণের দ্বারা কেবল যে ভারতবর্ষের ভূগোল জানা যেত তা নয়, তার নানাজাতীয় অধিবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আপনিই হত ; সেদিন ভারতবর্ষের আত্মোপলব্ধি