পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(?) • রবীন্দ্র-রচনাবলী থাকি এরা নির্মল শব্দকে সেই অর্থ দিয়েছে। এদিকে ক্রীড় শব্দ আমাদের অভিধানে খেলা, কিন্তু ক্রীড় বলতে এখানে বোঝাচ্ছে উদ্যোগ। রোগ দূর করাতেই ষার উদ্যোগ সেই হল ক্রীড়নির্মল। ফসলের খেতে ষে সেচ দেওয়া হয় তাকে এরা বলে সিন্ধুঅমৃত। এখানে জল অর্থেই সিন্ধু কথার ব্যবহার, ক্ষেত্রকে ষে-জলসেচ মৃত্যু থেকে বঁাচায় সেই হল সিন্ধু-অমৃত । আমাদের গৃহস্বামীর একটি ছেলের নাম সরোব, আর-একটির নাম সন্তোষ । বলা বাহুল্য, সরোব বলতে এখানে রাগী মেজাজের লোক বোঝায় না, বুঝতে হবে সতেজ। রাজার মেয়েটির নাম কুস্কমবধিনী। অনন্তকুম, জাতিকুমম, কুহুমায়ুধ, কুমুমব্রত, এমন সব নামও শোনা যায়। এদের নামে যেমন বিশুদ্ধ ও স্বগম্ভীর সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার এমনতরো আমাদের দেশে দেখা যায় না। যেমন আত্মস্থবিজ্ঞ, শাস্ত্রাত্ম, বীরপুস্তক, বীর্ষস্থশাস্ত্র, সহস্রপ্রবীর, বীর্যস্বত্রত, পদ্মস্থশাস্ত্র, কৃতাধিরাজ, সহস্রন্থগন্ধ, পূর্ণপ্রণত, যশোবিদগ্ধ, চক্রাধিরাজ, মৃতসঞ্চয়, আর্যস্বতীর্থ, কৃতস্মর, চক্রাধিত্রত, সূর্যপ্রণত, কৃতবিভব । সেদিন যে-রাজার বাড়িতে গিয়েছিলেম তার নাম স্থ হহুনন পাকু-ভূবন । তারই এক ছেলের বাড়িতে কাল আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল, তার নাম অভিমত্যু। এদের সকলেরই সৌজন্য স্বাভাবিক, নম্রতা সুন্দর। সেখানে মহাভারতের বিরাটপর্ব থেকে ছায়াভিনয়ের পালা চলছিল। ছায়াভিনয় এ দেশ ছাড়া আর কোথাও দেখি নি, অতএব বুঝিয়ে বলা দরকার। একটা সাদা কাপড়ের পট টাঙানো, তার সামনে একটা মস্ত প্রদীপ উজ্জল শিখা নিয়ে জলছে ; তার দুই ধারে পাতলা চামড়ায় আঁকা মহাভারতের নানা চরিত্রের ছবি সাজানো, তাদের হাতপাগুলো দড়ির টানে নড়ানো যায় এমনভাবে গাথা । এই ছবিগুলি এক-একটা লম্বা কাঠিতে বাধা । একজন স্থর করে গল্পটা আউড়ে যায়, আর সেই গল্প-অনুসারে ছবিগুলিকে পটের উপরে নানা ভঙ্গীতে নাড়াতে দোলাতে চালাতে থাকে। ভাবের সঙ্গে সংগতি রেখে গামেলান বাজে। এ যেন মহাভারতশিক্ষার একটা ক্লাসে পাঠের সঙ্গে ছবির অভিনয়-যোগে বিষয়টা মনে মুক্রিত করে দেওয়া। মনে করে, এমনি করে যদি স্কুলে ইতিহাস শেখানো যায়, মাস্টারমশায় গল্পটা বলে যান আর একজন পুতুল-খেলাওয়ালা প্রধান প্রধান ব্যাপারগুলো পুতুলের অভিনয় দিয়ে দেখিয়ে যেতে থাকে, আর সঙ্গে সঙ্গে ভাব-অনুসারে নানা স্বরে তালে বাজনা বাজে, ইতিহাস শেখাবার এমন স্বন্দর উপায় কি আর হতে পারে। মানুষের জীবন বিপদসম্পদ-মুখদুঃখের আবেগে নানাপ্রকার রূপে ধ্বনিতে স্পর্শে লীলায়িত হয়ে চলছে ; তার সমস্তটা যদি কেবল ধ্বনিতে প্রকাশ করতে হয় তা হলে সে একটা বিচিত্র সংগীত হয়ে ওঠে ; তেমনি আর-সমস্ত ছেড়ে দিয়ে সেটাকে কেবল