পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৩৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨S o রবীন্দ্র-রচনাবলী সরল, তাহার মধ্যে দুরূহত দুর্গমতা কিছুই নাই। আমাদের দেশের খুনী নররক্তপাতের উৎকট উত্তেজনা কোনোমতেই নিজের মধ্যে সংবরণ করিতে পারে না । জালিয়াত ষে-জাল বিস্তার করে তাহাতে অনতিবিলম্বে নিজেই আপাদমস্তক জড়াইয়া পড়ে, অপরাধব্যুহ হইতে নির্গমনের কূটকৌশল সে কিছুই জানে না। এমন নির্জীব দেশে ডিটেকটিভের কাজে স্থখও নাই, গৌরবও নাই । বড়োবাজারের মাড়োয়ারি জুয়াচোরকে অনায়াসে গ্রেপ্তার করিয়া কতবার মনে মনে বলিয়াছি, ‘ওরে অপরাধীকুলকলঙ্ক, পরের সর্বনাশ করা গুণী ওস্তাদলোকের কর্ম; তোর মতো আনাড়ি নির্বোধের সাধুতপস্বী হওয়া উচিত ছিল। খুনীকে ধরিয়া তাহার প্রতি স্বগত উক্তি করিয়াছি, ‘গবর্মেন্টের সমুন্নত ফাসিকাষ্ঠ কি তোদের মতে গৌরববিহীন প্রাণীদের জন্য হইয়াছিল– তোদের না আছে উদার কল্পনাশক্তি, না আছে কঠোর আত্মসংযম, তোরা বেটার খুনী হইবার স্পর্ধা করিস ? আমি কল্পনাচক্ষে যখন লগুন এবং প্যারিসের জনাকীর্ণ পথের দুই পাশ্বে শীতবাষ্পাকুল অভ্ৰভেদী হর্ম্যশ্রেণী দেখিতে পাইতাম তখন আমার শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিত। মনে মনে ভাবিতাম, এই হর্ম্যরাজি এবং পথ-উপপথের মধ্য দিয়া যেমন জনস্রোত কর্মস্রোত উৎসবস্রোত সৌন্দর্যস্রোত অহরহ বহিয়া যাইতেছে, তেমনি সর্বত্রই একটা হিংস্ৰকুটিল কৃষ্ণকুঞ্চিত ভয়ংকর অপরাধপ্রবাহ তলে তলে আপনার পথ করিয়া চলিয়াছে , তাহারই সামীপ্যে যুরোপীয় সামাজিকতার হাস্তকৌতুক শিষ্টাচার এমন বিরাটভীষণ রমণীয়তা লাভ করিয়াছে । আর, আমাদের কলিকাতার পথপাশ্বের মুক্তবাতায়ন গৃহশ্রেণীর মধ্যে রান্নাবাটন, গৃহকার্য, পরীক্ষার পাঠ, তালদাবার বৈঠক, দাম্পত্য কলহ, বড়োজের ভ্রাতৃবিচ্ছেদ এবং মকদ্দমার পরামর্শ ছাড়া বিশেষ কিছু নাই— কোনো-একটা বাড়ির দিকে চাহিয়া কখনো এ কথা মনে হয় না যে, হয়তো এই মুহূর্তেই এই গৃহের কোনো-একটা কোণে শয়তান মুখ গুজিয়া বলিয়া আপনার কালে কালে ডিমগুলিতে তা দিতেছে। আমি অনেক সময়ই রাস্তায় বাহির হইয়া পখিকদের মুখ এবং চলনের ভাব পর্যবেক্ষণ করিতাম , ভাবে ভঙ্গিতে যাহাদিগকে কিছুমাত্র সন্দেহজনক বোধ হইয়াছে আমি অনেক সময়ই গোপনে তাহদের অমুসরণ করিয়াছি, তাহীদের নামধাম ইতিহাস অনুসন্ধান করিয়াছি, অবশেষে পরম নৈরাশ্বের সহিত আবিষ্কার করিয়াছি— তাহারা নিষ্কলঙ্ক ভালোমানুষ, এমন-কি তাহীদের আত্মীয়-বান্ধবেরাও তাদের সম্বন্ধে আড়ালে কোনোপ্রকার গুরুতর মিথ্যা অপবাদও প্রচার করে না। পথিকদের মধ্যে সবচেয়ে যাহাঁকে পাষগু বলিয়া মনে হইয়াছে, এমন-কি যাহাকে দেখিয়া নিশ্চয় মনে করিয়াছি