পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী ہواہد কিছু প্রত্যাশ করে না, কেবল তুমি উপস্থিত হইয়া মাত্র তোমার অক্ষয় যৌবন তোমার অমান সৌন্দর্য লইয়া চারি দিকের এই-সকল বিপুল বিক্ষিপ্ত অনাথ জড়সামগ্রীরাশিকে একটি প্রাণের ঐক্যে সঞ্জীবিত করিয়া রাখে ; এই-সকল মূক প্রাণহীন পদার্থের অব্যক্ত ক্ৰন্দন গৃহকে শ্মশান করিয়া তুলিয়াছে। গভীর রাত্রে কখন একসময়ে বৃষ্টির ধারা এবং যাত্রার গান থামিয়া গেছে । ফণিভূষণ জানলার কাছে যেমন বসিয়া ছিল তেমনি বলিয়া আছে । বাতায়নের বাহিরে এমন একটা জগদব্যাপী নীরন্ধ অন্ধকার যে তাহার মনে হইতেছিল, যেন সম্মুখে যমালয়ের একটা অভ্ৰভেদী সিংহদ্বার, যেন এইখানে দাড়াইয়া কাদিয়া ডাকিলে চিরকালের লুপ্ত জিনিস অচিরকালের মতো একবার দেখা দিতেও পারে । এই মঙ্গীকৃষ্ণ মৃত্যুর পটে, এই অতি কঠিন নিকষ-পাষণের উপর সেই হারানো সোনার একটি রেখা পড়িতেও পারে । এমন সময় একটা ঠকঠক শব্দের সঙ্গে সঙ্গে গহনার ঝমৃঝম্ শব্দ শোনা গেল । ঠিক মনে হইল, শব্দটা নদীর ঘাটের উপর হইতে উঠিয়া আলিতেছে। তখন নদীর জল এবং রাত্রির অন্ধকার এক হইয়া মিশিয়া গিয়াছিল। পুলকিত ফণিভূষণ দুই উৎসুক চক্ষু দিয়া অন্ধকার ঠেলিয়া ঠেলিয়া ফুড়িয়া ফুড়িয়া দেখিতে চেষ্টা করিতে লাগিল— স্ফীত হৃদয় এবং ব্যগ্র দৃষ্টি ব্যথিত হইয়া উঠিল, কিছুই দেখা গেল না । দেখিবার চেষ্টা যতই একাস্ত বাড়িয়া উঠিল অন্ধকার ততই যেন ঘনীভূত, জগৎ ততই যেন ছায়াবং হইয়া আসিল । প্রকৃতি নিশীথরাত্রে আপন মৃত্যুনিকেতনের গবাক্ষদ্বারে অকস্মাৎ অতিথিসমাগম দেখিয়া দ্রুত হস্তে আরো একটা বেশি করিয়া পর্দা ফেলিয়া দিল । * শব্দটা ক্রমে ঘাটের সর্বোচ্চ সোপানতল ছাড়িয়া বাড়ির দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল । বাড়ির সম্মুখে আসিয়া থামিল। দেউড়ি বদ্ধ করিয়া দরোয়ান যাত্রা শুনিতে গিয়াছিল। তখন সেই রুদ্ধ দ্বারের উপর ঠকঠক কম্ঝম্ করিয়া ঘা পড়িতে লাগিল, যেন অলংকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত জিনিস দ্বারের উপর আসিয়া পড়িতেছে। ফণিভূষণ আর থাকিতে পারিল না। নির্বাণদীপ কক্ষগুলি পার হইয়া, অন্ধকার সিড়ি দিয়া নামিয়া, রুদ্ধ দ্বারের নিকট আলিয়া উপস্থিত হইল। দ্বার বাহির হইতে তালাবদ্ধ ছিল । ফণিভূষণ প্রাণপণে দুই হাতে সেই দ্বার নাড়া দিতেই সেই সংঘাতে এবং তাহার শৰে চমকিয় জাগিয়া উঠিল। দেখিতে পাইল, সে নিশ্রিত অবস্থায় উপর হইতে নীচে নামিয়া আসিয়াছিল। তাছার সর্বশরীর ঘর্ষাক্ত, হাত পা বরফের মতো ঠাও, এবং হৃৎপিও নির্বাণোন্মুখ প্রদীপের মতে