পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৯৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২৬৭ পূর্বেই আমি সে কোটা এবং শিশি এবং তুলি এবং বিধিবিধান সমস্তই সযত্বে আমাদের প্রাঙ্গণের পাতকুয়ার মধ্যে ফেলিয়া দিলাম । দাদার সঙ্গে কিছু আড়ি করিয়াই আমার স্বামী যেন আরো দ্বিগুণ চেষ্টায় আমার চোখের চিকিৎসায় প্রবৃত্ত হইলেন । এবেল ওবেলা ওষুধ বদল হইতে লাগিল । চোখে ঠুলি পরিলাম, চশমা পরিলাম, চোখে ফোটা ফোটা করিয়া ওষুধ ঢালিলাম, গুড়া লাগাইলাম, দুর্গন্ধ মাছের তেল খাইয়া ভিতরকার পাকযন্ত্রস্বদ্ধ যখন বাহির হইবার উদ্যম করিত তাহাও দমন করিয়া রছিলাম । স্বামী জিজ্ঞাসা করিতেন, কেমন বোধ হইতেছে । আমি বলিতাম, অনেকটা ভালো । আমি মনে করিতেও চেষ্টা করিতাম যে, ভালোই হইতেছে। যখন বেশি জল পড়িতে থাকিত তখন ভাবিতাম জল কাটিয়া যাওয়াই ভালো লক্ষণ ; যখন জল পড়া বন্ধ হইত তখন ভাবিতাম, এই তো আরোগ্য হইবার পথে দাড়াইয়াছি। কিন্তু কিছুকাল পরে যন্ত্রণা অসহ হইয়া উঠিল । চোখে ঝাপসা দেখিতে লাগিলাম এবং মাথার বেদনায় আমাকে স্থির থাকিতে দিল না । দেখিলাম, আমার স্বামীও যেন কিছু অপ্রতিভ হইয়াছেন। এতদিন পরে কী ছুতা করিয়া যে ডাক্তার ডাকিবেন, ভাবিয়া পাইতেছেন না। l আমি তাহাকে বলিলাম, "দাদার মন রক্ষার জন্ত একবার একজন ডাক্তার ডাকিতে দোষ কী। এই লইয়া তিনি অনর্থক রাগ করিতেছেন, ইহাতে আমার মনে কষ্ট হয়। চিকিৎসা তো তুমিই করিবে, ডাক্তার একজন উপসর্গ থাক ভালো ।” স্বামী কছিলেন, “ঠিক বলিয়াছ।” এই বলিয়া সেইদিনই এক ইংরাজ ডাক্তার লইয়া হাজির করিলেন। কী কথা হুইল জানি না কিন্তু মনে হইল, যেন সাহেব আমার স্বামীকে কিছু ভর্ৎসনা করিলেন ; তিনি নতশিরে নিরুত্তরে দাড়াইয়া রছিলেন । ডাক্তার চলিয়া গেলে আমি আমার স্বামীর হাত ধরিয়া বলিলাম, “কোথা হইতে একটা গোয়ার গোর-গর্দভ ধরিয়া আনিয়াছ, একজন দেশী ডাক্তার আনিলেই হইত। আমার চোখের রোগ ও কি তোমার চেয়ে ভালো বুঝিবে ।” স্বামী কিছু কুষ্ঠিত হইয়া বলিলেন, “চোখে অন্ত্র করা আবশুক হইয়াছে।” আমি একটু রাগের ভান করিয়া কছিলাম, "অন্ত্র করিতে হইবে, সে তো তুমি জানিতে কিন্তু প্রথম হইতেই সে কথা আমার কাছে গোপন করিয়া গেছ। তুমি কি মনে কর, আমি ভয় করি ”