পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩০৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


❖ፃom রবীন্দ্র-রচনাবলী আসিয়াছিল। আমি শুনিতে পাইলাম লে কহিল, "বাবা আমি গরিব, কিন্তু আল্লা তোমার ভালো করিবেন।” আমার স্বামী কছিলেন, “আল্লা যাহা করিবেন কেবল তাহাতেই আমার চলিবে না, তুমি কী করিবে সেটা আগে শুনি।” শুনিবামাত্র ভাবিলাম, ঈশ্বর আমাকে অন্ধ করিয়াছেন, কিন্তু বধির করেন নাই কেন । বৃদ্ধ গভীর দীর্ঘনিশ্বাসের সহিত ‘হে আল্লা বলিয়া বিদায় হইয়া গেল। আমি তখনই ঝিকে দিয়া তাহাকে অন্তঃপুরের খিড়কিম্বারে ডাকাইয়া আনিলাম ; কছিলাম, “বাবা, তোমার নাতনির জন্য এই ডাক্তারের খরচ কিছু দিলাম, তুমি আমার স্বামীর মঙ্গল প্রার্থনা করিয়া পাড়া হইতে হরিশ ডাক্তারকে ভাকিয়া লইয়া যাও।” কিন্তু সমস্ত দিন আমার মুখে অন্ন রুচিল না। স্বামী অপরাহ্লে নিদ্রা হইতে জাগিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাকে বিমর্ষ দেখিতেছি কেন।” পূর্বকালের অভ্যস্ত উত্তর একটা মুখে আসিতেছিল— ‘না, কিছুই হয় নাই’ ; কিন্তু ছলনার কাল গিয়াছে, আমি স্পষ্ট করিয়া বলিলাম, "কতদিন তোমাকে বলিব মনে করি, কিন্তু বলিতে গিয় ভাবিয়া পাই না, ঠিক কী বলিবার আছে। আমার অস্তরের কথাটা আমি বুঝাইয়া বলিতে পারিব কি না জানি না, কিন্তু নিশ্চয় তুমি নিজের মনের মধ্যে বুঝিতে পার, আমরা দুজনে যেমনভাবে এক হইয়া জীবন আরম্ভ করিয়াছিলাম আজ তাহা পৃথক হইয়া গেছে।” স্বামী হাসিয়া কহিলেন, “পরিবর্তনই তো সংসারের ধর্ম।” আমি কহিলাম, “টাকাকড়ি রূপযেীবন সকলেরই পরিবর্তন হয়, কিন্তু নিত্য জিনিস কি কিছুই নাই।” তখন তিনি একটু গভীর হইয়া কহিলেন, “দেখো, অন্ত স্ত্রীলোকেরা সত্যকার অভাব লইয়া দুঃখ করে— কাহারে স্বামী উপার্জন করে না, কাহারো স্বামী ভালোবালে না, তুমি আকাশ হইতে দুঃখ টানিয়া আন ।” আমি তখনই বুঝিলাম, অন্ধতা আমার চোখে এক অঞ্জন মাখাইয়া আমাকে এই পরিবর্তমান সংসারের বাহিরে লইয়া গেছে, আমি অন্ত স্ত্রীলোকের মতো নহি, আমাকে আমার স্বামী বুঝিবেন না । ইতিমধ্যে আমার এক পিসশাশুড়ি দেশ হইতে র্তাহার ভ্রাতুপুত্রের সংবাদ লইতে আসিলেন । আমরা উভয়ে তাহাকে প্রণাম করিয়া উঠিতেই তিনি প্রথম কথাতেই বলিলেন, “বলি, বউমা, তুমি তো কপালক্রমে দুইটি চক্ষু খোয়াইয়া বলিয়াছ, এখন আমাদের অবিনাশ অন্ধ স্ত্রীকে লইয়া ঘরকন্ন চালাইবে কী করিয়া। উহার আরএকটা বিয়ে-ধাওয়া দিয়া দাও ” স্বামী যদি ঠাট্টা করিয়া বলিতেন তা বেশ তো পিলিমা, তোমরা দেখিয়া শুনিয়া একটা ঘটকালি করিয়া দাও-না— তাহা হইলে সমস্ত পরিষ্কার হইয়া যাইত। কিন্তু তিনি কুষ্ঠিত হইয়া কহিলেন, “আঃ, পিলিমা, কী