পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৮২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


O&8 রবীন্দ্র-রচনাবলী মাহুষের সমগ্র মুক্ত দেহ নাচে ; নাচে মানুষের মুক্ত কণ্ঠের ভাষা। তাদের মধ্যে ছন্দের স্বষ্টিরহস্য যথেষ্ট জায়গা পায় ৷ সাপ অপদস্থ জীব, মানুষের মতো পদস্থ নয় । সমস্ত দেহ সে মাটিকে সমর্পণ করে বলেছে । সে কখনো নিজে নাচে না । সাপুড়ে তাকে নাচায়। বাহিরের উত্তেজনায় ক্ষণকালের জন্য দেহের এক অংশকে সে মুক্ত করে নেয়, তাকে দোলায় ছন্দে । এই ছন্দ সে পায় অন্যের কাছ থেকে, এ তার আপন ইচ্ছার ছন্দ নয় । ছন্দ মানেই ইচ্ছা । মানুষের ভাবনা রূপগ্রহণের ইচ্ছা করেছে নানা শিল্পে, নানা ছন্দে । কত বিলুপ্ত সভ্যতার ভগ্নাবশেষে বিস্মৃত যুগের ইচ্ছার বাণী আজও ধ্বনিত হচ্ছে তার কত চিত্রে, জলপাত্রে, কত মূর্তিতে। মানুষের আনন্দময় ইচ্ছা সেই ছন্দোলীলার নটরাজ, ভাষায় ভাষায় তার সাহিত্যে সেই ইচ্ছা নব নব নৃত্যে আন্দোলিত । মানুষের সহজ চলায় অব্যক্ত থাকে নৃত্য, ছন্দ যেমন প্রচ্ছন্ন থাকে গদ্যভাষায় । কোনো মানুষের চলাকে বলি সুন্দর, কোনোটাকে বলি তার উলটো । তফাতটা কিসে। সে কেবল একটা সমস্তাসমাধান নিয়ে । দেহের ভার সামলিয়ে দেহের চল। একটা সমস্তা। ভারটাই যদি অত্যন্ত প্রত্যক্ষ হয়, তা হলেই অসাধিত সমস্তা প্রমাণ করে অপটুতা । যে চলায় সমস্তার সমুংকৃষ্ট মীমাংসা সেই চলাই সুন্দর। পালে-চলা নেীকে স্বন্দর, তাতে নৌকোর ভারটার সঙ্গে নৌকোর গতির সম্পূর্ণ মিলন ; সেই পরিণয়ে শ্ৰী উঠেছে ফুটে, অতিপ্রয়াসের অবমান হয়েছে অস্তৰ্হিত। এই মিলনেই ছন্দ । দাড়ি দাড় টানে, সে লগি ঠেলে, কঠিন কাজের ভারটাকে সে কমিয়ে আনে কেবল ছন্দ রেখে । তখন কাজের ভঙ্গি হয় স্বন্দর । বিশ্ব চলেছে প্রকাণ্ড ভার নিয়ে বিপুল দেশে নিরবধি কালে স্থপরিমিতির ছন্দে। এই সুপরিমিতির প্রেরণায় শিশিরের ফোটা থেকে স্বর্যমণ্ডল পর্যস্ত স্বগোল ছন্দে গড়া। এইজন্যেই ফুলের পাপড়ি স্ববঙ্কিম, গাছের পাতা সুঠাম, জলের ঢেউ স্বডোল । জাপানে ফুলদানিতে ফুল সাজাবার একটি কলাবিদ্যা আছে। যেমন-তেমন আকারে পুঞ্জীকৃত পুষ্পিত শাখায় বস্তুভারটাই প্রত্যক্ষ ; তাকে ছন্দ দিয়ে যেই শিল্প করা যায়, তখন সেই ভারটা হয় অগোচর, হালকা হয়ে গিয়ে অস্তরে প্রবেশ করে সহজে । প্রাচীন জাপানের একজন বিখ্যাত বীর এই ফুল সাজানো দেখতে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, এই সজ্জাপ্রকরণ থেকে তার মনে আসত আপন যুদ্ধব্যবসায়ের প্রেরণা। যুদ্ধও ছন্দে-বাধা শিল্প, ছন্দের সমুখকর্ষ থেকেই তার শক্তি। এই কারণেই লাঠিখেলাও নৃত্য ।