পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


इब्ल లష్ట్రా সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার একটা প্রভেদ এই যে, বাংলার প্রায় সর্বত্রই শব্দের অস্তস্থিত অ-স্বরবর্ণের উচ্চারণ হয় না । যেমন— ফল, জল, মাঠ, ঘাট, চাদ, ফাদ, বাদর, আদর ইত্যাদি । ফল শব্দ বস্তুত এক মাত্রার কথা। অথচ সাধু বাংলাভাষার ছন্দে ইহাকে দুই মাত্রা বলিয়া ধরা হয় । অর্থাৎ ফল এবং ফল বাংলা ছন্দে একই ওজনের । এইরূপে বাংলা সাধুছন্দে হসন্ত জিনিসটাকে একেবারে ব্যবহারে লাগানো হয় না। অথচ জিনিসটা ধ্বনি উৎপাদনের কাজে ভারি মজবুত। হসন্ত শব্দটা স্বরবর্ণের বাধা পায় না বলিয়া পরবর্তী শব্দের ঘাড়ের উপর পড়িয়া তাহাকে ধাক্কা দেয় ও বাজাইয়া তোলে। ‘করিতেছি’ শব্দটা ভেঁাতা। উহাতে কোনো স্বর বাজে না কিন্তু ‘কfচ’ শব্দে একটা স্বর অাছে । যাহা হইবার তাহাই হইবে’ এই বাক্যের ধ্বনিটা অত্যন্ত ঢ়িলা ; সেইজন্য ইহার অর্থের মধ্যেও একটা আলস্ত প্রকাশ পায় । কিন্তু, যখন বলা যায় ‘যা হবার তাই হবে? তখন "হুবার’ শব্দের হসন্ত-‘র’ ‘তাই’ শব্দের উপর আছাড় খাইয়া একটা জোর জাগাইয়া তোলে , তখন উহার নাকী স্থর ঘুচিয়া গিয়া ইহা হইতে একটা মরিয়া ভাবের আওয়াজ বাহির হয়। বাংলার হলস্তবর্জিত সাধু ভাষাটা বাবুদের আদুরে ছেলেটার মতো মোটাসোটা গোলগল ; চর্বির স্তরে তাহার চেহারাটা একেবারে ঢাকা পড়িয়া গেছে, এবং তাহার চিকণতা যতই থাক, তাহার জোর অতি অল্পই । কিন্তু, বাংলার অসাধু ভাষাটা খুব জোরালো ভাষা, এবং তাহার চেহারা বলিয়া একটা পদার্থ আছে। আমাদের সাধু ভাষার কাব্যে এই অসাধু ভাষাকে একেবারেই আমল দেওয়া হয় নাই ; কিন্তু, তাই বলিয়া অসাধু ভাষা যে বাসায় গিয়া মরিয়া আছে তাহা নহে। সে আউলের মুখে, বাউলের মুখে, ভক্ত কবিদের গানে, মেয়েদের ছড়ায় বাংলাদেশের চিত্তটাকে একেবারে শু্যামল করিয়া ছাইয়া রহিয়াছে। কেবল ছাপার কালির তিলক পরিয়া সে ভজসাহিত্যসভায় মোড়লি করিয়া বেড়াইতে পারে না। কিন্তু, তাহার কণ্ঠে গান থামে নাই, তাহার কাশের বঁশি বাজিতেছেই। সেই-সব মেঠো-গানের ঝরনার তলায় বাংলাভাষার হসন্ত-শব্দগুলা মুড়ির মতো পরস্পরের উপর পড়িয়া ঠুনঠুন শৰ করিতেছে। আমাদের ভদ্রসাহিত্যপল্লীর গভীর দিঘিটার স্থির জলে সেই শব্দ নাই , সেখানে হলস্তর ঝংকার বন্ধ । আমার শেষ বয়সের কাব্য-রচনায় আমি বাংলার এই চলতি ভাষার স্বরটাকে ব্যবহারে লাগাইবার চেষ্টা করিয়াছি । কেননা দেখিয়াছি, চলতি ভাষাটাই স্রোতের জলের মতো চলে, তাহার নিজের একটি কলধ্বনি আছে। গীতাঞ্জলি’ হইতে আপনি ১ গীতিমাল্য ? २>॥२१