পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


স্বদেশ । 8為》 ল্যাগুর সাহেব কুমায়ুনে আলমোড় হইতে যাত্রা আরম্ভ করিলেন। সঙ্গে এক হিন্দু চাকর আসিয়া জুটিল, তাহার নাম চন্দন সিং । কুমায়ুনের প্রাস্তে তিব্বতের সীমানায় বৃটিশ রাজ্যে শোক বলিয়া এক পাহাড়ি জাত আছে । তিব্বতিদের ভয়ে ও উপত্রবে তাহার কম্পমান । বৃটিশরাজ তিব্বতিদের পীড়ন হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিতে পারেন না বলিয়া ল্যাগুর সাহেব বার স্বার অাক্ষেপ প্রকাশ করিয়াছেন। সেই শোকাদের মধ্য হইতে সাহেবকে কুলি মজুর সংগ্ৰহ করিয়া লইতে হইবে । বহুকষ্টে ত্রিশজন কুলি জুটিল । ইহার পর হইতে যাত্রাকালে সাহেবের এক প্রধান চিন্তা ও চেষ্টা, কিসে কুলির না পালায় । তাহদের পালাইবার যথেষ্ট কারণ ছিল । ল্যাগুর তাহার ভ্রমণবৃত্তান্তের পচিশ পরিচ্ছেদে লিখিয়াছেন— এই বাহকদল যখন নিঃশব্দ গম্ভীরভাবে বোঝা পিঠে লইয়া করুণাজনক স্বাসকষ্টের সহিত হাপাইতে ইপিাইতে উচ্চ হইতে উচ্চে আরোহণ করিতেছিল তখন এই ভয় মনে হইতেছিল, ইহাদের মধ্যে কয়জনই বা কোনো কালে ফিরিয়া যাইতে পরিবে । আমাদের জিজ্ঞাস্য এই যে, এ শঙ্কা যখন তোমার মনে আছে তখন এই অনিচ্ছুক হতভাগ্যদিগকে মৃত্যুমুখে তাড়না করিয়া লইয়া যাওয়াকে কী নাম দেওয়া যাইতে পারে। তুমি পাইবে গৌরব এবং তাহার সঙ্গে অর্থলাভের সম্ভাবনাও যথেষ্ট আছে। তুমি তাহার প্রত্যাশায় প্রাণপণ করিতে পার, কিন্তু ইহাদের সম্মুখে কোন প্রলোভন আছে ? বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে জীবচ্ছেদ (vivisection ) লইয়া য়ুরোপে অনেক তর্কবিতর্ক হইয়া থাকে। সজীব জস্তুদিগকে লইয়া পরীক্ষা করিবার সময়ে যন্ত্রণানাশক ঔষধ প্রয়োগ করিবার ঔচিত্যও আলোচিত হয়। কিন্তু বাহাদুরি করিয়া বাহবা লইবার উদ্দেশে দীর্ঘকাল ধরিয়া অনিচ্ছুক মানুষদের উপরে যে অসহ পীড়ন চলে ভ্রমণবৃত্তান্তের গ্রন্থে তাহার বিবরণ প্রকাশ হয়, সমালোচকেরা করতালি দেন, সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া যায়, হাজার হাজার পাঠক ও পাঠিক এই-সকল বর্ণনা বিস্ময়ের সহিত পাঠ ও আনন্দের সহিত আলোচনা করেন। দুর্গম তুষারপথে নিরীহ শোকা বাহকদল দিবারাত্র যে অসহ্য কষ্ট ভোগ করিয়াছে তাহার পরিণাম কী। ল্যাগুর সাহেব নাহয় লাগায় পৌছিলেন, তাহাতে জগতের এমন কী উপকার হওয়া সম্ভব যাহাতে এই সকল ভীত পীড়িত পলায়নেচ্ছ মানুষদিগকে অহরহ এত কষ্ট দিয়া মৃত্যুর পথে তাড়ন করা লেশমাত্র বিহিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে । কিন্তু কই, এজন্ত তো লেখকের সংকোচ নাই, পাঠকের অনুকম্পা নাই ! তিব্বতির কিরূপ নিষ্ঠুরভাবে পীড়ন ও হত্যা করিতে পারে, শোকার সেই কারণে