পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্দশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হচ্ছে, কত আঘাত করতে হচ্ছে—সেই সমস্ত আঘাতের মধ্যেই বিশ্বকৰ্মার স্বজনের আনন্দে আমার অধিকার জন্মাত । কিন্তু যে অন্তরের গুহার মধ্যে আনন্দিত বিশ্বকর্ম দিন রাত্রি বসে কাজ করছেন সেদিকে আমি তো তাকালুম না—আমি সমস্ত জীবন বাইরের দিকেই ছা করে তাকিয়ে রইলুম। দশজনের সঙ্গে মিলছি মিশছি হাসি গল্প করছি আর ভাবছি কোনো মতে দিন কেটে যাচ্ছে—ধেন দিনটা কাটানোই হচ্ছে দিনটা পাবার উদ্দেশু । যেন দিনের কোনো অর্থ নেই । আমরা যেন মানবজীবনের নাট্যশালায় প্রবেশ করে যেদিকে অভিনয় হচ্ছে সেদিকে মূঢ়ের মতো পিঠ ফিরিয়ে বসে আছি। নাট্যশালার থামগুলো চৌকিগুলো এবং লোকজনের ভিড়ই দেখছি । তার পরে যখন আলো নিবে গেল, যবনিকা পড়ে গেল, জার কিছুই দেখতে পাই নে, অন্ধকার নিবিড়—তখন হয়তো নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, কী করতে এসেছিলুম, কেনই বা টিকিটের দাম দিলুম, এই থাম চৌকির অর্থ কী, এতগুলো লোকই বা এখানে জড় হয়েছে কী করতে ? সমস্তই ফাকি, সমস্তই অর্থহীন ছেলেখেলা । হায়, আনন্দের অভিনয় যে নাট্যমঞ্চে হচ্ছে সে-দিকের কোনো খবরই পাওয়া গেল না। জীবনের আনন্দলীলা যিনি করছেন তিনি যে এই ভিতরে বসেই করছেন—ওই থাম চৌকিগুলো যে বহিরঙ্গ মাত্র। ওইগুলিই প্রধান সামগ্রী নয়। একবার অন্তরের দিকে চোখ ফেরাও—তখনই সমস্ত মানে বুঝতে পারবে । যে কাগুট হচ্ছে সমস্তই যে অন্তরে হচ্ছে । এই যে অন্ধকার কেটে গিয়ে এখনই ধীরে ধীরে স্বর্ষোদয় হচ্চে একি কেবলই তোমার বাইরে ? বাইরেই যদি হত তবে তুমি সেখানে কোন দিক দিয়ে প্রবেশ করতে ? বিশ্বকর্ম যে তোমার চৈতন্তাকাশকে এই মুহূর্তে একেবারে অরুণরাগে প্লাবিত করে দিলেন। চেয়ে দেখো তোমারই অস্তরে তরুণ স্বর্য সোনার পদ্মের কুঁড়ির মতো মাথা তুলে উঠছে, একটু একটু করে জ্যোতির পাপড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে দেবার উপক্রম করছে—তোমারই অন্তরে। এই তো বিশ্বকৰ্মার আনন্দ । তোমারই এই জীবনের জমিতে তিনি এত সোনার স্বতে রুপোর স্কুতো এত রং-বেরঙের স্বতে দিয়ে অহরহ এতবড়ো একটা আশ্চর্য বুনানি বুনছেন—এ ষে তোমার ভিতরেই—যা একেবারে বাইরে সে যে তোমার নয় । তবে এখনই দেখো। এই প্রভাতকে তোমারই অস্তরের প্রভাত বলে দেখে, তোমারই চৈতন্তের মধ্যে তার আনন্দ-স্বটি বলে দেখো। এ আর কারও নয়, এ আর কোথাও নেই—তোমার এই প্রভাতটি একমাত্র তোমারই মধ্যে রয়েছে এবং সেখানে একলামাত্র তিনিই রয়েছেন । তোমার এই স্থগভীর নির্জনতার মধ্যে তোমার এই