পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্দশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৯৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8bre রবীন্দ্র-রচনাবলী শাস্ততার দ্বারাই ঝড়ের চেয়ে তার শক্তি বেশি । এই জন্তেই ঝড় চিরদিন টিকতে পারে না, এই জন্তেই ঝড় কেবল সংকীর্ণ স্থানকেই কিছুকালের জন্ত ক্ষুদ্ধ করে, আর শাম্ভ বায়ুপ্রবাহ সমস্ত পৃথিবীকে নিত্যকাল বেষ্টন করে থাকে। যথার্থ নম্রতা, বা সাত্ত্বিকতার তেজে উজ্জল, যা ত্যাগ ও সংযমের কঠোর শক্তিতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত সেই নম্রতাই সমস্তের সঙ্গে অবাধে যুক্ত হয়ে সত্যভাবে নিত্যভাবে সমস্তকে লাভ করে। সে কাউকে দূর করে না, বিচ্ছিন্ন করে না, আপনাকে ত্যাগ করে এবং সকলকেই আপন করে। এই জন্তেই ভগবান যিশু বলেছেন যে, ষে বিনম্র সেই পৃথীবিজয়ী, শ্রেষ্ঠধনের অধিকার একমাত্র তারই । ছুটির পর শাস্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়ে ছুটির পর আমরা সকলে আবার এখানে একত্র হয়েছি। কর্ম থেকে মাঝে মাঝে আমরা যে এইরূপ অবসর নিই সে কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হবার জন্য নয়--কর্মের সঙ্গে যোগকে নবীন রাখবার এই উপায় । মাঝে মাঝে কর্মক্ষেত্র থেকে যদি এই রকম দূরে না যাই তবে কর্মের যথার্থ তাৎপর্ব আমরা বুঝতে পারি নে। অবিশ্রাম কর্মের মাঝখানে নিবিষ্ট হয়ে থাকলে কর্মটাকেই অতিশয় একাস্ত করে দেখা হয় । কর্ম তখন মাকড়সার জালের মতে। আমাদের চারদিক থেকে এমনি আচ্ছন্ন করে ধরে যে তার প্রকৃত উদ্বেগু কী তা বুঝবার সামর্থ্যই আমাদের থাকে না । এই জন্য অভ্যস্ত কর্মকে পুনরায় নূতন করে দেখবার স্থযোগ লাভ করব বলেই এক একবার কর্ম থেকে আমরা সরে যাই । কেৰল মাত্র ক্লান্ত শক্তিকে বিশ্রাম দেওয়াই তার উদ্দেশ্য নয়। আমরা কেবলই কর্মকেই দেখব না । কর্তাকেও দেখতে হবে। কেবল জাগুনের প্রখর তাপ ও এঞ্জিনের কঠোর শব্দের মধ্যে আমরা এই সংসার-কারখানার যুটেমজুরের মতোই সর্বাঙ্গে কালিকুল মেখে দিন কাটিয়ে দেব না। একবার দিনান্তে স্বান করে কাপড় ছেড়ে কারখানার মনিবকে যদি দেখে আসতে পারি তবে তার সঙ্গে আমাদের কাজের যোগ নির্ণয় করে কলের একাধিপত্যের হাত এড়াতে পারি, তবেই কাজে আমাদের আনন্দ জন্মে। নতুবা কেবলই কলের চাক চালাতে চালাতে আমরাও কলেরই শামিল হয়ে উঠি ।