পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্দশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


俄-8 রবীজ-রচনাবলী এই শুভযোগে আশ্রমকে সার্থক করে তোলো। প্রস্তরের উপর দিয়ে জলস্রোত যেমন করে বহে যায়, সেখানে দাড়াবার কোনোই স্থান পায় না, আমাদের হৃদয়ের উপর দিয়ে তেমনি করে এই প্রবাহ যেন বহে না যায় ! ঈশ্বরের প্রসাম্রোত আজ সমস্ত পৃথিবীর উপর দিয়ে বিশেষভাবে প্রবাহিত হবার সময় এখানে এলে একবারটি যেন পাক খেয়ে দাড়ায় । সমস্ত আশ্রমটি যেন কানায় কানায় ভরে ওঠে । শুধু আমাদের এই ক্ষুদ্র আশ্রমটি কেন, পৃথিবীর যেখানে যে-কোনো ছোটাে বড়ো সাধনার ক্ষেত্র আছে মঙ্গল-বারিতে আজ পূর্ণ হ’ক আশ্রমে বাস করে এই দিনে জীবনকে ব্যর্থ হতে দিও না। এখানে কি শুধু তুচ্ছ কথায় মেতে হিংসা দ্বেষের মধ্যে থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে দিন কাটাতে এসেছ ? শুধু পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করে ফুটবল খেলে এতবড়ো একটা জীবনকে নিঃশেষ করে দেবে ? কখনোই ন+–এ হতে পারে না। এই যুগের ধর্ম তোমাদের প্রাণকে স্পর্শ করুক। তপস্তার দ্বারা কুন্দর হয়ে তোমরা ফুটে ওঠে। আশ্রম-বাস তোমাদের সার্থক হ’ক । তোমরা যদি মহন্ধুত্বের সাধনাকে প্রাণপণ করে ধরে না রাখ, শুধু খেলা ধুলা পড়া শুনার ভিতর দিয়েই যদি জীবনকে চালিয়ে দাও, তবে যে তোমাদের অপরাধ হবে, তার আর মার্জনা নেই, কারণ তোমরা আশ্রমবাসী । আবার বলি, তোমর কোন কালে এই পৃথিবীতে এসেছ, ভালো করে সেই কালের বিষয় ভেবে দেখো । বর্তমান কালের একটি স্ববিধা এই, বিশ্বের মধ্যে ষে চাঞ্চল্য উঠেছে একই সময়ে সকল দেশের লোক তা অনুভব করছে। পূর্বে একস্থানে তরঙ্গ । উঠলে অন্ত স্থানের লোকেরা তার কোনোই খবর পেত না । প্রত্যেক দেশটি স্বতন্ত্র ছিল। এক দেশের খবর অন্য দেশে গিয়ে পৌছোবার উপায় ছিল না। এখন আর সে দিন নেই। দেশের কোনো স্থানে ঘা লেগে তরঙ্গ উঠলে সেই তরঙ্গ শুধু দেশের মধ্যে না, সমস্ত পৃথিবীর ভিতর দিয়ে তীরের মতো ছুটে চলে। আমরা সকলে এক হয়ে দাড়াই। কত দিক হতে আমরা বল পাই ; সত্যকে অঁাকড়ে ধরবার যে মহা নির্যাতন তাকে অনায়াসেই সহ করতে পারি ; নানাদিক হতে দৃষ্টান্ত ও সমবেদন এসে জোর দেয়—এ কি কম কথা। নিজেকে অসহায় বলে মনে করি না। এই তো মহা স্কুয়োগ । এমন দিনে আশ্রম-বাসের স্বযোগকে হারিও না । জীবন যদি তোমাদের ব্যর্থ হয়, আশ্রমের কিছুই আসে যায় না—ক্ষতি তোমাদেরই। গাছ ভরে বউল আসে সকল বউলেই যে ফল হয় এমন নয়। কত ঝরে পড়ে, শুকিয়ে যায়, তবু ফলের অভাব হয় না। ডাল ভরে ফল ফলে ওঠে। ফল হল না বলে গাছ দুঃখ করে না, দুঃখ করাবউলের, তারা যে ফলে পরিণত হয়ে উঠতে পারল না।