পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্বিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২২৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২১৭ আজ যুগের পরিবর্তন হয়েছে, আমার ভাগ্যের পরির্তন হয় নি। আজও কলিকা বলে, “তোমার সঙ্গে বেরতে আমার লজ্জা করে। তখন কলিকা যে-দলে ছিল তাদের উর্দি আমি ব্যবহার করি নি, আজ যে-দলে ভিড়েছে তাদের উর্দিও গ্রহণ করতে পারলুম না। আমাকে নিয়ে আমার স্ত্রীর লজ্জা সমানই রয়ে গেল। এটা আমারই স্বভাবের দোষ । যে-কোনো দলেরই হোক, ভেক ধারণ করতে আমার সংকোচ লাগে। কিছুতেই এটা কাটাতে পারলুম না। অপর পক্ষে মতান্তর জিনিসটা কলিকা খতম করে মেনে নিতে পারে না। ঝরনার ধারা যেমন মোটা পাথরটাকে বারে বারে ঘুরে ফিরে তর্জন করে বৃথা ঠেলা দিতেই থাকে, তেমনি ভিন্ন রুচিকে চলতে ফিরতে দিনে রাত্রে ঠেলা না দিয়ে কলিকা থাকতে পারে না ; পৃথক মত নামক পদার্থের সংস্পৰ্শমাত্র ওর স্বায়ুতে যেন দুর্নিবারভাবে স্থড়ম্বড়ি লাগায়, ওকে একেবারে ছটফটয়ে তোলে। কাল চায়ের নিমন্ত্রণে যাবার পূর্বেই আমার নিষ খন্ধর বেশ নিয়ে একসহস্র-একতম বার কলিকা যে আলোচনা উত্থাপিত করেছিল, তাতে তার কণ্ঠস্বরে মাধুৰ্যমাত্র ছিল না। বুদ্ধির অভিমান থাকাতে বিনা তর্কে তার ভৎসনা শিরোধার্য করে নিতে পারি নি— স্বভাবের প্রবর্তনায় মানুষকে এত ব্যর্থ চেষ্টাতেও উৎসাহিত করে। তাই আমিও একসহস্র-একতম বার কলিকাকে খোটা দিয়ে বললুম, “মেয়ের বিধিদত্ত চোখটার উপর কালাপেড়ে মোটা ঘোমটা টেনে আচারের সঙ্গে আঁচলের গাট বেঁধে চলে । মননের চেয়ে মাননেই তাদের আরাম। জীবনের সকল ব্যবহারকেই রুচি ও বুদ্ধির স্বাধীন ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে সংস্কারের জেনানায় পর্দানশীন করতে পারলে তারা বঁাচে । আমাদের এই আচারজীর্ণ দেশে খন্দর-পরাটা সেইরকম মালাতিলকধারী ধাৰ্মিকতার মতোই একটা সংস্কারে পরিণত হতে চলেছে বলেই মেয়েদের ওতে এত আনন্দ ।” কলিকা রেগে অস্থির হয়ে উঠল । তার আওয়াজ শুনে পাশের ঘর থেকে দাসীটা মনে করলে, ভার্ষাকে পুরো ওজনের গয়না দিতে কর্তা বুঝি ফাকি দিয়েছে। কলিকা বললে, “দেখো, খন্দর-পরার শুচিত যেদিন গঙ্গাস্বানের মতোই দেশের লোকের সংস্কারে বাধা পড়ে যাবে সেদিন দেশ বঁাচবে। বিচার যখন স্বভাবের সঙ্গে এক হয়ে যায় তখনি সেটা হয় আচার। চিন্তা যখন আকারে দৃঢ়বন্ধ হয় তখনি সেটা হয় সংস্কার ; তখন মানুষ চোখ বুজে কাজ করে যায়, চোখ খুলে দ্বিধা করে না।” এই কথাগুলো অধ্যাপক নয়নমোহনের আগুবাক্য, তার থেকে কোটেশনমার্কা ক্ষয়ে গিয়েছে, কলিকা ওগুলোকে নিজের স্বচিন্তিত বলেই জানে ।