পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্বিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৯৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কালান্তর । Տեrd করিয়াছে এই সহজ প্রণালীতে গ্রস্থি কাটা পড়ে বটে কিন্তু মালের গুরুতর লোকসান ঘটে। সভ্যতার একটা দায়িত্ব আছে, সকল সংকটেই সে দায়িত্ব তাহাকে রক্ষা করিতে হইবে। শাস্তি দেওয়ার মধ্যে একটা দারুণতা অনিবার্য বলিয়াই শাস্তিটাকে ষ্ঠায়বিচার-প্রণালীর ফিলটারের মধ্য দিয়া ব্যক্তিগত রাগদ্বেষ- ও পক্ষপাত- পরিশুম্ভ করিয়া সভ্যসমাজ তবে তাহাকে গ্রহণ করিতে পারে। তাহ না হইলেই লাঠিয়ালের লাঠি এবং শাসনকর্তার স্তায়দণ্ডের মধ্যে প্রভেদ বিলুপ্ত হইতে থাকে। স্বীকার করি, কাজ কঠিন হইয়াছে। বাংলাদেশের একদল বালক ও যুবক স্বদেশের সঙ্গে স্বদেশীর সত্য যোগসাধনের বাধা-অতিক্রমের যে পথ অবলম্বন করিয়াছে তাহার জন্তু আমরা লজ্জিত আছি । আরো লজ্জিত এইজন্ত যে, দেশের প্রতি কর্তব্যনীতির সঙ্গে ধর্মনীতির বিচ্ছেদসাধন করায় অকর্তব্য নাই এ কথা আমরা পশ্চিমের কাছ হইতেই শিখিয়াছি। পলিটিক্সের গুপ্ত ও প্রকাশু মিথ্যা এবং পলিটিক্সের গুপ্ত ও প্রকাশু দস্থ্যবৃত্তি পশ্চিম সোনার সহিত খাদ মিশানোর মতো মনে করেন, মনে করেন ওটুকু না থাকিলে সোনা শক্ত হয় না। আমরাও শিথিয়াছি যে, মানুষের পরমার্থকে দেশের স্বার্থের উপরে বসাইয়া ধৰ্ম লইয়া টিকটিক করিতে থাকা মূঢ়তা, দুর্বলতা, ইহা সেটিমেন্টালিজম— বর্বরতাকে দিয়াই সভ্যতাকে এবং অধৰ্মকে দিয়াই ধর্মকে মজবুত করা চাই। এমনি করিয়া আমরা যে কেবল অধৰ্মকে বরণ করিয়া লইয়াছি তাহা নহে, আমাদের গুরুমশায়দের যেখানে বীভৎসতা, সেই বীভৎসতার কাছে মাখা হেঁট করিয়াছি । নিজের মনের জোরে ধর্মের জোরে গুরুমশায়ের উপরে দাড়াইয়াও এ কথা বলিবার তেজ ও প্রতিভা আমাদের আজ নাই যে, অধৰ্মেনৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশুতি, ততঃ সপত্ত্বান জয়তি সমূলস্তু বিনশুতি । অর্থাৎ অধর্মের দ্বারা মানুষ বাড়িয়া উঠে, অধর্ম হইতে সে আপন কল্যাণ দেখে, অধর্মের দ্বারা সে শত্রুদিগকেও জয় করে, কিন্তু একেবারে মূল হইতে বিনাশ পায় । তাই বলিতেছি, গুরুমশায়দের কাছে আমাদের ধর্মবুদ্ধিরও যে এত-বড়ো পরাভব হইয়াছে ইহাতেই আমাদের সকলের চেয়ে বড়ো লজ্জা । বড়ো আশা করিয়াছিলাম, দেশে যখন দেশভক্তির আলোক জলিয়া উঠিল তখন আমাদের প্রকৃতির মধ্যে যাহা সকলের চেয়ে মহৎ তাহাই উজ্জল হইয়া প্রকাশ পাইবে ; আমাদের যাহা যুগসঞ্চিত অপরাধ তাহা আপন অন্ধকার কোণ ছাড়িয়া পালাইয়া যাইবে ; দুঃসহ নৈরাতের পাষাণপ্তর বিদীর্ণ করিয়া অক্ষয় অাশার উৎস উৎসারিত হইয়া উঠিবে এবং দুরূহ নিরুপায়তাকেও উপেক্ষা করিয়া অপরাহত ধৈর্ষ এক-এক পা করিয়া আপনার রাজপথ