পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্বিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৩৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কালান্তর । ૭.૬ আছে সেটা চলবার যোগ্য গাড়ি, তার এক চাকার সঙ্গে আরেক চাকার সামঞ্জস্য আছে, তার এক অংশের সঙ্গে আরেক অংশের ভালোৱকম জোড় মেলানো আছে। এই গাড়িটি তৈরি করে তুলতে শুধু আগুন এবং হাতুড়ি-করাত এবং কলকজা লেগেছে তা নয়, এর মধ্যে অনেক দিনের অনেক লোকের অনেক চিন্তা অনেক সাধনা অনেক ত্যাগ আছে । আরো এমন দেশ আমরা দেখেছি, সে বাহত স্বাধীন, কিন্তু পোলিটিকাল বাহনটি যখন তাকে টানতে থাকে তখন তার ঝড় ঝড়, খড় খড়, শব্দে পাড়ার ঘুম ছুটে যায়, ঝাকানির চোটে সওয়ারির বুকে পিঠে খিল ধরতে থাকে, পথ চলতে চলতে দশবার করে সে ভেঙে ভেঙে পড়ে, দড়ি-দড় দিয়ে তাকে বাধতে রাধত্তে দিন কাবার হয়ে যায়। তৰু ভালো হোক আর মন্দ্ৰ হোক, ক্ষু আলগা হোক তার চাকা বাক৷ হোক, এ গাড়িও গাড়ি, কিন্তু যে জিনিসটা ঘরে বাইরে সাত টুকরো হয়ে আছে, যার মধ্যে সমগ্রতা কেবল যে নেই তা নয়, ষা বিরুদ্ধতায় ভরা, তাকে উপস্থিতমত ক্রোধ হোক বা লোভ হোক কোনে-একটা প্রবৃত্তির বাহবন্ধনে বেঁধে হেঁই হেঁই শৰে টান দিলে কিছুক্ষণের জন্তে তাকে নড়ানো যায়— কিন্তু একে কি দেশদেবতার রথযাত্রা বলে। এই প্রবৃত্তির বন্ধন এবং টান কি টেকসই জিনিস। অতএব ঘোড়াটাকে আস্তাবলে রেখে আপাতত এই গড়াপেটার কাজটাই কি সবচেয়ে দরকার নয়। যমের ফঁাসিবিভাগের সিংহদ্বার থেকে বাংলাদেশের যে-সব যুবক ঘরে ফিরে এসেছেন তাদের লেখা পড়ে কথা শুনে আমার মনে হয় তারা এই কথাই ভাবছেন । তারা বলছেন, সকলের আগে আমাদের যোগসাধন চাই, দেশের সমস্ত চিত্তবৃত্তির সন্মিলন ও পরিপূর্ণত -সাধনের যোগ। বাইরের দিক থেকে কোনো অন্ধ বাধ্যতা দ্বারা এ হতেই পারে না, ভিতরের দিক থেকে জ্ঞানালোকিত চিত্তে আত্মোপলব্ধি দ্বারাই এ সম্ভব । য-কিছুতে সমস্ত দেশের অন্তঃকরণ উদবোধিত হয় না, অভিভূত হয়, এ কাজের পক্ষে তা জন্তুরায় । নিজের স্বষ্টিশক্তির দ্বার। দেশকে নিজের করে তোলবার যে আহবান সে খুব একটা বড়ো আহবান। সে কোনে-একটা বাহ অনুষ্ঠানের জন্তে তাগিদ দেওয়া নয়। কারণ, পূর্বেই বলেছি মানুষ তো মৌমাছির মতো কেবল একই মাপে মৌচাক গড়ে না, মাকড়সার মতো নিরস্তর একই প্যাটানে জাল বোনে না। তার সকলের চেয়ে বড়ো শক্তি হচ্ছে তার অন্তঃকরণে— সেই অন্তঃকরণের কাছে তার পুরো দাবি, জড় অভ্যাসপরতার কাছে নয়। মদি কোনো লোভে পড়ে তাকে আজ বলি, তুমি চিন্তা কোরো না, কর্ম করে, তা হলে ষে মোহে আমাদের দেশ মরেছে সেই মোহকে প্রশ্ৰয় দেওয়া হবে । এতকাল ধরে আমরা অমুশাসনের কাছে, প্রথার কাছে মানবমনের সর্বোচ্চ