পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩০৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী واسSb লাগিল, মহেন্দ্রের মন ততই উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল— অবশেষে দুই-চার দিন আগে সে বলিয়া বসিল, “না মা, আমি কিছুতেই পারিব না ।” বাল্যকাল হইতে মহেন্দ্র দেবতা ও মানবের কাছে সর্বপ্রকারে প্রশ্রয় পাইয়াছে, এইজন্য তাহার ইচ্ছার বেগ উচ্ছ স্থল। পরের ইচ্ছার চাপ সে সহিতে পারে না। তাহাকে নিজের প্রতিজ্ঞ এবং পরের অনুরোধ একান্ত বাধ্য করিয়া তুলিয়াছে বলিয়াই বিবাহ-প্রস্তাবের প্রতি তাহার অকারণ বিতৃষ্ণ অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল এবং আসন্নকালে সে একেবারেই বিমুখ হইয়া বসিল । মহেন্দ্রের পরম বন্ধু ছিল বিহারী ; সে মহেন্দ্রকে দাদা এবং মহেন্দ্রের মাকে মা বলিত । মা তাহাকে স্টীমবোটের পশ্চাতে আবদ্ধ গাধাবোটের মতো মহেন্দ্রের একটি আবখ্যক ভারবহ আসবাবের স্বরূপ দেখিতেন ও সেই হিসাবে মমতাও করিতেন । রাজলক্ষ্মী তাহাকে বলিলেন, “বাবা, এ কাজ তো তোমাকেই করিতে হয়, নহিলে গরিবের মেয়ে—” বিহারী জোড়হাত করিয়া কহিল, “মা, ওইটে পারিব না । যে-মেঠাই তোমার মহেন্দ্র ভালো লাগিল না বলিয়া রাখিয়া দেয়, সে-মেঠাই তোমার অনুরোধে পড়িয়া আমি অনেক খাইয়াছি, কিন্তু কন্যার বেলা সেটা সহিবে না।” রাজলক্ষ্মী ভাবিলেন, “বিহারী আবার বিয়ে করিবে ! ও কেবল মহিনকে লইয়াই আছে, বউ আনিবার কথা মনেও স্থান দেয় না।” এই ভাবিয়া বিহারীর প্রতি র্তাহার কৃপামিশ্রিত মমতা আর-একটুখানি বাড়িল । বিনোদিনীর বাপ বিশেষ ধনী ছিল না, কিন্তু তাহার একমাত্র কন্যাকে সে মিশনারি মেম রাখিয়া বহুষত্বে পড়াশুনা ও কারুকার্য শিখাইয়াছিল । কন্যার বিবাহের বয়স ক্রমেই বহিয়া যাইতেছিল, তবু তাহার ছশ ছিল না। অবশেষে তাহার মৃত্যুর পরে বিধবা মাতা পাত্র খুজিয়া অস্থির হইয়া পড়িয়াছে। টাকাকড়িও নাই, কন্যার বয়সও অধিক । তখন রাজলক্ষ্মী তাহার জন্মভূমি বারাশতের গ্রামসম্পৰ্কীয় এক ভ্রাতু-পুত্রের সহিত উক্ত কন্যা বিনোদিনীর বিবাহ দেওয়াইলেন । অনতিকাল পরে কন্যা বিধবা হইল। মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “ভাগ্যে বিবাহ করি নাই, স্ত্রী বিধবা হইলে তো এক দণ্ডও টিকিতে পারিতাম না !” বছর-তিনেক পরে আর-এক দিন মাতাপুত্রে কথা হইতেছিল । “বাবা, লোকে যে আমাকেই নিন্দ করে ।” "কেন মা, লোকের তুমি কী সর্বনাশ করিয়াছ ?”