পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩০২ রবীন্দ্র-রচনাবলী কহিল, "তার চেয়ে তুমি স্বয়ং দিনরাত্রি আমাকে চোখে চোখে রাখিয়া পাহারা দাও, দেখে আমি একজামিনের পড়া মুখস্থ করি কি না ।” অতি সহজেই সেই কথা স্থির হইল। চোখে চোখে পাহারার কার্য কিরূপ ভাবে নির্বাহ হইত, তাহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া অনাবশ্বক— কেবল এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, সে-বৎসর মহেন্দ্র পরীক্ষায় ফেল করিল এবং চারুপাঠের বিস্তারিত বর্ণনা সত্বেও পুরুভূজ সম্বন্ধে আশার অনভিজ্ঞতা দূর হইল না। এইরূপ অপূর্ব পঠন-পাঠন-ব্যাপার যে সম্পূর্ণ নির্বিয়ে সম্পন্ন হইয়াছিল, তাহ বলিতে পারি না। বিহারী মাঝে মাঝে আসিয়া অত্যন্ত গোল বাধাইয়া দিত। “মহিনদা, মহিনদা” করিয়া সে পাড়া মাথায় করিয়া তুলিত। মহেন্দ্রকে তাহার শয়নগৃহের বিবর হইতে টানিয়া না বাহির করিয়া সে কোনোমতেই ছাড়িত না । পড়ায় শৈথিল্য করিতেছে বলিয়া সে মহেন্দ্রকে বিস্তর ভৎসনা করিত। আশাকে বলিত, “বউঠান, গিলিয়া খাইলে হজম হয় না, চিবাইয়া খাইতে হয়— এখন সমস্ত অল্প এক গ্রাসে গিলিতেছ, ইহার পরে হজমি গুলি খুজিয়া পাইবে না।” মহেন্দ্র বলিত, "চুনি, ও-কথা শুনিয়ো না— বিহারী আমাদের স্বখে হিংসা করিতেছে।” বিহারী বলিত, “মুখ যখন তোমার হাতেই আছে, তখন এমন করিয়া ভোগ করো যাহাতে পরের হিংসা না হয়।” মহেন্দ্র উত্তর করিত, “পরের হিংসা পাইতে যে স্থখ আছে। চুনি, আর একটু হইলেই আমি গর্দভের মতো তোমাকে বিহারীর হাতে সমর্পণ করিতেছিলাম।” বিহার রক্তবর্ণ হইয়া বলিয়া উঠিত, "চুপ!” এই সকল ব্যাপারে আশা মনে মনে বিহারীর উপরে ভারি বিরক্ত হইত। এক সময় তাহার সহিত বিহারীর বিবাহ-প্রস্তাব হইয়াছিল বলিয়াই বিহারীর প্রতি তাহার এক প্রকার বিমুখ ভাব ছিল, বিহারী তাহা বুঝিত এবং মহেন্দ্র তাহা লইয়া আমোদ করিত। রাজলক্ষ্মী বিহারীকে ভাকিয়া দুঃখ করিতেন । বিহারী কহিত, “মা, পোকা যখন গুটি বাধে, তখন তত বেশি ভয় নয়— কিন্তু যখন কাটিয়া উড়িয়া যায়, তখন ফেরানো শক্ত । কে মনে করিয়াছিল, ও তোমার বন্ধন এমন করিয়া কাটিবে ।” মহেঞ্জের ফেল-করা সংবাদে রাজলক্ষ্মী গ্রীষ্মকালের আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের মতো দাউ দাউ করিয়া জলিয়া উঠিলেন, কিন্তু তাহার গর্জন এবং দাহনটা সম্পূর্ণ ভোগ করিলেন অন্নপূর্ণ। তাহার আহারনিদ্ৰা দূর হইল।