পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি \S)0:6. আবার বিনোদিনী দম্ভ দিয়া স্থত ছেদন করিল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “এখন বুঝি জিয়স্তের আবশ্যক।” 海 মহেন্দ্র স্থির করিয়াছিল, আজ বিনোদিনীর সঙ্গে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে হাস্তপরিহাস উত্তরপ্রত্যুত্তর করিয়া আসর জমাইয়া তুলিবে । কিন্তু এমনি গাম্ভীর্ষের ভার তাহার উপর চাপিয়া আসিল যে, লঘু জবাব প্রাণপণ চেষ্টাতেও মুখের কাছে জোগাইল না। বিনোদিনী আজ কেমন একরকম কঠিন দুরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছে দেখিয়া, মহেন্দ্রের মনটা সবেগে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল—ব্যবধানটাকে কোনো একটা নাড়া দিয়া ভূমিসাৎ করিতে ইচ্ছা হইল। বিনোদিনীর শেষ বাক্যঘাতের প্রতিঘাত না দিয়া, হঠাৎ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কহিল, “তুমি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছ কেন । কোনো অপরাধ করিয়াছি ?” বিনোদিনী তখন একটু সরিয়া সেলাই হইতে মুখ তুলিয়া দুই বিশাল উজ্জল চক্ষু -মহেন্দ্রের মুখের উপর স্থির রাখিয়া কহিল, "কর্তব্যকর্ম তো সকলেরই আছে। আপনি যে সকল ছাড়িয়া কালেজের বাসায় যান, সে কি কাহারও অপরাধে । আমারও যাইতে হইবে না ? আমারও কতব্য নাই ?” মহেন্দ্র ভালো উত্তর অনেক ভাবিয়া খুজিয়া পাইল না কিছুক্ষণ থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার এমন কী কর্তব্য যে না গেলেই নয়।” বিনোদিনী অত্যন্ত সাবধানে স্থচিতে স্বতা পরাইতে পরাইতে কহিল, “কর্তব্য আছে কি না, সে নিজের মনই জানে। আপনার কাছে তাহার আর কী তালিকা দিব ।” মহেন্দ্র গম্ভীর চিন্তিত মুখে জানালার বাহিরে একটা স্থদুর নারিকেলগাছের মাথার দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনী নিঃশব্দে সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল। ঘরে ছুঁচটি পড়িলে শব্দ শুনা যায়, এমনি হইল। অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র হঠাৎ কথা কহিল। অকস্মাৎ নি:শবাতাভঙ্গে বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল— তাহার হাতে.ছচ ফুটিয়া গেল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমাকে কোনো অকুনয়-বিনয়েই রাখা যাইবে না ?” বিনোদিনী তাহার আহত অঙ্গুলি হইতে রক্তবিন্দু শুষিয়া লইয়া কহিল, “কিসের জন্য এত অকুনয়-বিনয় । আমি থাকিলেই কী, আর না থাকিলেই কী । আপনার তাহাতে কী আসে ষায় ।” বলিতে বলিতে গলাটা যেন ভারি হইয়া আসিল ; বিনোদিনী অত্যন্ত মাথা নিচু করিয়া সেলাইয়ের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিল—মনে হইল, হয়তো বা তাহার