পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি \e রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের এইরূপ অত্যন্ত শূন্তভাব দেখিয়া ভাবিলেন, “বউ গিয়াছে, তাই এ-বাড়িতে মহিনের কিছুই আর ভালো লাগিতেছে না ।" আজকাল মহেন্দ্রের সুখদুঃখের পক্ষে মা যে বউয়ের তুলনায় একান্ত অনাবশু্যক হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মনে করিয়া তাহাকে বিধিল— তবু মহেন্দ্রের এই লক্ষ্মীছাড়া বিমর্ষ ভাব দেখিয়া তিনি বেদন পাইলেন। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিলেন, “সেই ইনফ্লুয়েঞ্জার পর হইতে আমার হাপানির মতো হইয়াছে ; আমি তো আজকাল সিড়ি ভাঙিয়া ঘন ঘন উপরে যাইতে পারি না । তোমাকে বাছা, নিজে থাকিয়া মহিনের খাওয়াদাওয়া সমস্তই দেখিতে হইবে । বরাবরকার অভ্যাস, একজন কেহ যত্ব না করিলে মহিন থাকিতে পারে না । দেখো-না, বউ যাওয়ার পর হইতে ও কেমন একরকম হইয়া গেছে । বউকেও ধন্য বলি, কেমন করিয়া গেল ?” f বিনোদিনী একটুখানি মুখ বাকাইয়া বিছানার চাদর খুঁটিতে লাগিল । রাজলক্ষ্মী কহিলেন, "কী বউ, কী ভাবিতেছ। ইহাতে ভাবিবার কথা কিছু নাই । যে যাত৷ বলে বলুক, তুমি আমাদের পর নও।” বিনোদিনী কহিল, “কাজ নাই, মা ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আচ্ছা, তবে কাজ নাই । দেখি আমি নিজে যা পারি তাই করিব।” বলিয়া তখনই তিনি মহেন্দ্রের তেতলার ঘর ঠিক করিবার জন্য উদ্যত হইলেন । বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “তোমার অস্থখ-শরীর, তুমি যাইয়ো না, আমি যাইতেছি। আমাকে মাপ করো পিসিমা, তুমি যেমন আদেশ করিবে আমি তাহাই করিব।” রাজলক্ষ্মী লোকের কথা একেবারেই তুচ্ছ করিতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর হইতে ংসারে এবং সমাজে তিনি মহেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না । মহেন্দ্র সম্বন্ধে বিনোদিনী সমাজনিন্দার আভাস দেওয়াতে তিনি বিরক্ত হইয়াছিলেন । আজন্মকাল তিনি মহিনকে দেখিয়া আসিতেছেন, তাহার মতো এমন ভালো ছেলে আছে কোথায় । সেই মহিনের সম্বন্ধেও নিন্দা ! যদি কেহ করে, তবে তাহার জিহব। খসিয়া যাক। র্তাহার নিজের কাছে ষেটা ভালো লাগে ও ভালো বোধ হয় সে-সম্বন্ধে বিশ্বের লোককে উপেক্ষা করিবার জন্য রাজলক্ষ্মীর একটা স্বাভাবিক জেদ ছিল । 顧 আজ মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া আপনার শয়নঘর দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। দ্বার খুলিয়াই দেখিল, চন্দনগুড়া ও ধুনার গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়া