পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি । رنسانها বিহারী এই চিরপুত্রহীন রমণীর স্নেহ-সিংহাসনে পুত্রের মানস-আদৰ্শরূপে বিরাজ করিত। বিহারীকে তিনি সংসারে প্রতিষ্ঠিত দেখিয়া আসিতে পারেন নাই, এ-দুঃখ প্রবাসে আসিয়া প্রতিদিন তাহার মনে জাগিত । র্তাহার ক্ষুদ্র সংসারের আর-সমস্তই এক প্রকার সম্পূর্ণ হইয়াছে, কেবল বিহারীর সেই গৃহহীন অবস্থা স্মরণ করিয়াই তাহার পরিপূর্ণ বৈরাগ্যচর্চার ব্যাঘাত ঘটে। আশা কহিল, "মাসি, বিহারী-ঠাকুরপোর কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়ো না।” অন্নপূর্ণ আশ্চর্ষ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন বল দেখি ।” আশা কহিল, “সে আমি বলিতে পারিব না।” বলিয়া ঘর হইতে উঠিয়া গেল । অন্নপূর্ণ চুপ করিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন, “অমন সোনার ছেলে বেহারী, এরই মধ্যে তাহার কি এতই বদল হইয়াছে যে, চুনি আজ তাহার নাম শুনিয়া উঠিয়া যায়। অদৃষ্টেরই খেলা। কেন তাহার সহিত চুনির বিবাহের কথা হইল, কেনই বা মহেন্দ্র তাহার হাতের কাছ হইতে চুনিকে কাড়িয়া লইল।” । অনেক দিন পরে আজ আবার অন্নপূর্ণার চোখ দিয়া জল পড়িল,— মনে-মনে তিনি কহিলেন, “আহা, আমার বিহারী যদি এমন কিছু করিয়া থাকে যাহা অামার বেহারীর যোগ্য নহে, তবে সে তাহা অনেক দুঃখ পাইয়াই করিয়াছে, সহজে করে নাই।” বিহারীর সেই দুঃখের পরিমাণ কল্পনা করিয়া অন্নপূর্ণার বক্ষ ব্যথিত হইতে লাগিল । সন্ধ্যার সময় যখন অন্নপূর্ণ আহিকে বসিয়াছেন, তখন একটা গাড়ি আসিয়া দরজায় থামিল, এবং সহিস বাড়ির লোককে ডাকিয়া রুদ্ধ দ্বারে ঘা মারিতে লাগিল । অন্নপূর্ণ পূজাগৃহ হইতে বলিয়া উঠিলেন, “ওই যা, আমি একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছিলাম, আজ কুঞ্জর শাশুড়ীর এবং তার দুই বোনঝির এলাহাবাদ হইতে আসিবার কথা ছিল। ওই বুঝি তাহারা আসিল । চুনি, তুই একবার আলোটা লইয়া দরজা খুলিয়া দে।” আশা লণ্ঠন-হাতে দরজা খুলিয়া দিতেই দেখিল, বিহারী দাড়াইয়। বিহারী বলিয়া উঠিল, “এ কী বোঠান, তবে যে শুনিলাম, তুমি কাশী আসিবে না।” আশার হাত হইতে লণ্ঠন পড়িয়া গেল। সে যেন প্রেতমূর্তি দেখিয়া এক নিশ্বাসে দোতলায় ছুটিয়া গিয়া আতশ্বরে বলিয়া উঠিল, “মাসিম, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, উহাকে এখনই যাইতে বলে ।” অন্নপূর্ণ পূজার আসন হইতে চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, “কাহাকে চুনি, কাহাকে ।”