পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি \లీసెరి • বিনোদিনী কহিল, “পিসিম, বেশ তো, আজ সন্ধ্যাবেলা আমরা দু-জনেই ঠাকুরপোর বই-পড়া শুনিতে আসিব— কী বল ।” রাজলক্ষ্মী ভাবিলেন, “মহিন আমার নিতান্ত একলা পড়িয়াছে, এখন সকলে মিলিয় তাহাকে ভুলাইয়া রাখা আবশ্যক।” কহিলেন, “তা বেশ তো, মহিনের খাবার-তৈরি শেষ করিয়। আমরা আজ সন্ধ্যাবেল পড়া শুনিতে আসিব । কী বলিস, মহিন ।” বিনোদিনী মহেন্দ্রের মুখের দিকে কটাক্ষপাত করিয়া একবার দেখিয়া লইল । মহেন্দ্র কহিল, “আচ্ছা।” কিন্তু তাহার আর উৎসাহ রহিল না। বিনোদিনী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে-সঙ্গেই বাহির হইয়া গেল । মহেন্দ্র রাগ করিয়া ভাবিল, “আমিও আজ বাহির হইয়া যাইব—দেরি করিয়া বাড়ি ফিরিব।” বলিয়া তখনই বাহিরে যাইবার কাপড় পরিল। কিন্তু সংকল্প কাজে পরিণত হইল না । মহেন্দ্র অনেকক্ষণ ধরিয়া ছাদে পায়চারি করিয়া বেড়াইল, সিড়ির দিকে অনেকবার চাহিল, শেষে ঘরের মধ্যে আসিয়া বসিয়া পড়িল । বিরক্ত হইয়া মনে মনে কহিল, “আমি আজ মিঠাই স্পর্শ না করিয়া মাকে জানাইয়া দিব, এত দীর্ঘকাল ধরিয়া চিনির রস জাল দিলে তাহাতে মিষ্টত্ব থাকে না ।” আজ আহারের সময় বিনোদিনী রাজলক্ষ্মীকে সঙ্গে করিয়া আনিল । রাজলক্ষ্মী র্তাহার হাপানির ভয়ে প্রায় উপরে উঠিতে চান না, বিনোদিনী তাহাকে অনুরোধ করিয়াই সঙ্গে আনিয়াছে। মহেন্দ্র অত্যন্ত গম্ভীর মুখে খাইতে বসিল । বিনোদিনী কহিল, “ও কী ঠাকুরপো, আজ তুমি কিছুই খাইতেছ না যে ।” রাজলক্ষ্মী ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিছু অস্থখ করে নাই তো ?” বিনোদিনী কহিল, “এত করিয়া মিঠাই করিলাম, কিছু মুখে দিতেই হইবে। ভালো হয়নি বুঝি ? তবে থাক্ । না না, অমুরোধে পড়িয়া জোর করিয়া খাওয়া কিছু নয়। না না, কাজ নাই ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “ভালো মুশকিলেই ফেলিলে । মিঠাইটাই সব চেয়ে খাইবার ইচ্ছা, লাগিতেছেও ভালো, তুমি বাধা দিলে শুনিব কেন।” দুইটি মিঠাই মহেন্দ্র নিঃশেষপূর্বক খাইল— তাহার একটি দানা, একটু গুড়া পর্যন্ত ফেলিল না । இற: আহারান্তে তিন জনে মহেঞ্জের শোবার ঘরে আসিয়া বসিলেন । পড়িবার প্রস্তাবটা মহেন্দ্র আর তুলিল না। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তুই যে কী বই পড়িবি বলিয়াছিল, আরম্ভ কর না।”