পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি |లీనిని বিহারী আজ অনেক দিন পরে নিমন্ত্রিত-আত্মীয়ভাবে মহেন্দ্রের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল। বাল্যকাল হইতে যে ঘর তাহার পরিচিত এবং যেখানে সে ঘরের ছেলের মতো অবারিতভাবে প্রবেশ করিয়া দৌরাত্ম্য করিয়াছে, তাহার স্বারের কাছে আসিয়া মুহূর্তের জন্য সে থমকিয়া দাড়াইল— একটা অশ্রাতরঙ্গ পলকের মধ্যে উচ্ছসিত হইয়া উঠিবার জন্য তাহার বক্ষকবাটে আঘাত করিল । সেই আঘাত ংবরণ করিয়া লইয়া সে স্মিতহাস্তে ঘরে প্রবেশ করিয়া সদ্যঃস্নাতা রাজলক্ষ্মীকে প্ৰণাম করিয়া তাহার পায়ের ধুলা লইল । বিহারী যখন সর্বদা যাতায়াত করিত, তখন এরূপ অভিবাদন তাহাদের প্রথা ছিল না। আজ যেন সে বহুদূরপ্রবাস হইতে পুনর্বার ঘরে ফিরিয়া আসিল। বিহারী প্রণাম করিয়া উঠিবার সময় রাজলক্ষ্মী সস্নেহে তাহার মাথায় হস্তম্পর্শ করিলেন । রাজলক্ষ্মী আজ নিগুঢ় সহানুভূতিবশত বিহারীর প্রতি পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি আদর ও স্নেহ প্রকাশ করিলেন । কহিলেন, “ও বেহারি, তুই এতদিন আসিস নাই কেন । আমি রোজ মনে করিতাম, আজ নিশ্চয় বেহারি আসিবে, কিন্তু তোর আর দেখা নাই ।” বিহারী হাসিয়া কহিল, “রোজ আসিলে তো তোমার বিহারীকে রোজ মনে করিতে না, মা । মহিনদা কোথায় ।” * রাজলক্ষ্মী বিমর্ষ হইয়া কহিলেন, “মহিনের আজ কোথায় নিমন্ত্রণ আছে, সে আজ কিছুতেই থাকিতে পারিল না।” শুনিবামাত্র বিহারীর মনটা বিকল হইয়া গেল ৷ আশৈশব প্রণয়ের শেষ এই পরিণাম ? একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মন হইতে সমস্ত বিষাদবাষ্প উপস্থিতমতে তাড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিয়া বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “আজ কী রান্না হইয়াছে শুনি ৷” বলিয়া তাহার নিজের প্রিয় ব্যঞ্জনগুলির কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল । রাজলক্ষ্মীর রন্ধনের দিন বিহারী কিছু অতিরিক্ত আড়ম্বর করিয়া নিজেকে লুদ্ধ বলিয়া পরিচয় দিত— আহারলোলুপতা দেখাইয়া বিহারী মাতৃহৃদয়শালিনী রাজলক্ষ্মীর স্নেহ কাড়িয়া লইত । আজও তাহার স্বরচিত ব্যঞ্জন সম্বন্ধে বিহারীর অতিমাত্রায় কৌতুহল দেখিয়া, রাজলক্ষ্মী হাসিতে হাসিতে র্তাহার লোভাতুর অতিথিকে আশ্বাস দিলেন । , এমন সময় মহেন্দ্ৰ আসিয়া বিহারীকে শুষ্কম্বরে দস্তুরমতো জিজ্ঞাসা করিল, *কী বিহারী, কেমন আছ ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কই মহিন, তুই তোর নিমন্ত্রণে গেলি না।”