পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি 8 eS হাতের কাটা ঘা সহ করিয়াছিল, তেমনি করিয়া ইহাও সহ্য করিল। নিতান্ত মিনতির স্বরে কহিল, “আমার মাথ গাও, একবার বসিবে চলো ।” মহেন্দ্র হঠাৎ অসংগতভাবে উত্তেজিত হইয়া বলিয়া উঠিল, “তোমাদের কিছুই তো বিবেচনা নাই— কাজ থাক্ কৰ্ম থাক, ইচ্ছা থাক্ বা না থাক, তবু বসিতেই হইবে। এত অধিক আদরের আমি তো কোনো মানে বুঝিতে পারি না।” বিনোদিনী, উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল । কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, শোনো একবার, তোমার মহিনদার কথা শোনো। অাদরের মানে আদর, অভিধানে তাহার আর কোনো দ্বিতীয় মানে লেখে না।” ( মহেঞ্জের প্রতি ) “যাই বল ঠাকুরপো, অধিক আদরের মানে শিশুকাল হইতে তুমি যত পরিষ্কার বোঝ, এমন আর কেহ বোঝে না ।” বিহারী কহিল, “মহিনদা, একটা কথা আছে, একবার শুনিয়া যাও।” বলিয়া বিহারী বিনোদিনীকে কোনো বিদায়সম্ভাষণ না করিয়া মহেন্দ্রকে লইয়া বাহিরে গেল । বিনোদিনী বারান্দার রেলিং ধরিয়া চুপ করিয়া দাড়াইয়া শূন্ত উঠানের শূন্যতার দিকে তাকাইয়া রহিল। বিহারী বাহিরে আসিয়া কহিল, “মহিনদা, আমি জানিতে চাই, এইখানেই কি আমাদের বন্ধুত্ব শেষ হইল।” মহেঞ্জের বুকের ভিতর তখন জলিতেছিল, বিনোদিনীর পরিহাস-হাস্য বিদ্যুৎশিখার মতো তাহার মস্তিষ্কের এক প্রাস্ত হইতে আর-এক প্রাস্ত বারংবার ফিরিয়া ফিরিয়া বিধিতেছিল— সে কহিল, “মিটমাট হইলে তোমার তাহাতে বিশেষ সুবিধা হইতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তাহা প্রার্থনীয় বোধ হয় না। আমার সংসারের মধ্যে আমি বাহিরের লোক ঢুকাইতে চাই না— অস্তঃপুরকে আমি অন্তঃপুর রাখিতে চাই ।” বিহারী কিছু না বলিয়া চলিয়া গেল । ঈর্ষাজর্জর মহেন্দ্র একবার প্রতিজ্ঞা করিল বিনোদিনীর সঙ্গে দেখা করিব না— তাহার পরে বিনোদিনীর সহিত সাক্ষাতের প্রত্যাশায় ঘরে-বাহিরে, উপরে-নিচে ছটফট করিয়া বেড়াইতে লাগিল । રે જે আশা একদিন অন্নপূর্ণাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা মাসিমা, মেসোমশায়কে তোমার মনে পড়ে ?”