পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


863 রবীন্দ্র-রচনাবলী অন্নপূর্ণ কহিলেন, “আমি এগারো বৎসর বয়সে বিধবা হইয়াছি, স্বামীর মূতি ছায়ার মতো মনে হয় ।” আশা জিজ্ঞাসা করিল, "মাসি, তবে তুমি কাহার কথা ভাব ।” অন্নপূর্ণ ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, “আমার স্বামী এখন র্যাহার মধ্যে আছেন, সেই ভগবানের কথা ভাবি ।” l আশা কহিল, “তাহাতে তুমি মুখ পাও ?” অন্নপূর্ণ সস্নেহে আশার মাথায় হাত বুলাইয়া কহিলেন, “আমার সে মনের কথা তুই কী বুঝিবি বাছা । সে আমার মন জানে, আর র্যার কথা ভাবি তিনিই জানেন ।” আশা মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “আমি র্যার কথা রাত্রিদিন ভাবি, তিনি কি আমার মনের কথা জানেন না। আমি ভালো করিয়া চিঠি লিখিতে পারি না বলিয়া তিনি কেন আমাকে চিঠি লেখা ছাড়িয়া দিয়াছেন।” আশা কয়দিন মহেন্দ্রের চিঠি পায় নাই। নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে সে ভাবিল, “চোখের বালি যদি হাতের কাছে থাকিত, সে আমার মনের কথা ঠিকমতো করিয়া লিথিয়া দিতে পারিত।” কুলিখিত তুচ্ছপত্র স্বামীর কাছে আদর পাইবে না মনে করিয়া চিঠি লিখিতে কিছুতে আশার হাত সরিত না । যতই যত্ব করিয়া লিখিতে চাহিত, ততই তাহার অক্ষর খারাপ হইয়া যাইত। মনের কথা যতই ভালো করিয়া গুছাইয়া লইবার চেষ্টা করিত ততই তাহার পদ কোনোমতেই সম্পূর্ণ হইত না। যদি একটিমাত্র “শ্ৰীচরণেষু” লিথিয় নাম সহি করিলেই মহেন্দ্র অন্তর্যামী দেবতার মতো সকল কথা বুঝিতে পারিত, তাহা হইলেই আশার চিঠিলেখা সার্থক হইত। বিধাতা এতখানি ভালোবাসা দিয়াছিলেন, একটুখানি ভাষা দেন নাই কেন । মন্দিরে সন্ধ্যারতির পরে গৃহে ফিরিয়া আসিয়াং আশা অন্নপূর্ণার পায়ের কাছে বসিয়া আস্তে আস্তে র্তাহার পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল । অনেকক্ষণ নিঃশবের পর বলিল, “মাসি, তুমি যে বল, স্বামীকে দেবতার মতো করিয়া সেবা করা স্ত্রীর ধর্ম, কিন্তু যে স্ত্রী মূখ, যাহার বুদ্ধি নাই, কেমন করিয়া স্বামীর সেবা করিতে হয় যে জানে না, সে কী করিবে ।” অন্নপূর্ণ কিছুক্ষণ আশার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন— একটি চাপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “বাছা, আমিও তো মূখ, তবুও তো ভগবানের সেবা করিয়৷ থাকি।” ஆ