পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৪৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8૨૭ রবীন্দ্র-রচনাবলী বক্ষে চাপিয়া ধরিল—তাহার পরে সে একটি অপরূপ মায়ালতার মতো নিমেষের মধ্যেই বিহারীকে বেষ্টন করিয়া বাড়িয়া উঠিয়া সন্তোবিকশিত হুগন্ধি পুষ্পমঞ্জরিতুল্য একখানি চুম্বনোন্মুখ মুখ বিহারীর ওষ্ঠের নিকট আনিয়া উপনীত করিল। বিহারী চক্ষু বুজিয়া সেই কল্পমূর্তিকে স্থতিলোক হইতে নির্বাসিত করিয়া দিবার চেষ্টা করিতে লাগিল ; কিন্তু কোনোমতেই তাহাকে আঘাত করিতে যেন তাহার হাত উঠিল না— একটি অসম্পূর্ণ ব্যাকুল চুম্বন তাহার মুখের কাছে আসন্ন হইয়া রহিল, পুলকে তাহাকে আবিষ্ট করিয়া তুলিল । বিহারী ছাতের নির্জন অন্ধকারে আর থাকিতে পারিল না । আর-কোনো দিকে মন দিবার জন্ত সে তাড়াতাড়ি দীপোলোকিত ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। কোণে টিপাইয়ের উপর রেশমের-ঢাকা-দেওয়া একখানি বাধানো ফোটোগ্রাফ ছিল। বিহারী ঢাকা খুলিয়া সেই ছবিটি ঘরের মাঝখানে আলোর নিচে লইয়া বসিল— কোলের উপর রাখিয়া দেখিতে লাগিল । ছবিটি মহেন্দ্র ও আশার বিবাহের অনতিকাল পরের যুগলমূর্তি। ছবির পশ্চাতে মহেন্দ্র নিজের অক্ষরে “মহিনদা” এবং আশা স্বহস্তে "আশা" এই নামটুকু লিখিয়া দিয়াছিল । ছবির মধ্যে সেই নবপরিণয়ের মধুর দিনটি আর ঘুচিল না। মহেন্দ্র চৌকিতে বসিয়া আছে, তাহার মুখে নূতন বিবাহের একটি নবীন সরস ভাবাবেশ ; পাশে আশা দাড়াইয়া— ছবিওয়ালা তাহাকে মাথায় ঘোমটা দিতে দেয় নাই, কিন্তু তাহার মুখ হইতে লজ্জাটুকু খসাইতে পারে নাই । আজ মহেন্দ্র তাহার পাশ্বচরী আশাকে কাদাইয়া কত দূরে চলিয়৷ ঘাইতেছে, কিন্তু জড় ছবি মহেন্দ্রের মুখ হইতে নবীন প্রেমের একটি রেখাও বদল হইতে দেয় নাই, কিছু না বুঝিয়া মূঢ়ভাবে অদৃষ্টের পরিহাসকে স্থায়ী করিয়া রাখিয়াছে । এই ছবিখানি কোলে লইয়া বিহারী বিনোদিনীকে ধিক্কারের দ্বারা স্থদ্বরে নির্বাসিত করিতে চাহিল। কিন্তু বিনোদিনীর সেই প্ৰেমে-কাতর যৌবনে-কোমল ৰাহুচুটি বিহারীর জানু চাপিয়া রহিল। বিহারী মনে মনে কহিল, "এমন স্বন্দর প্রেমের সংসার ছারখার করিয়া দিলি ।” কিন্তু বিনোদিনীর সেই উধেবর্ণংক্ষিপ্ত ব্যাকুল মুখের চুম্বন-নিবেদন তাহাকে নীরবে কহিতে লাগিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি । সমস্ত জগতের মধ্যে আমি তোমাকে বরণ করিয়াছি।” কিন্তু এই কি জবাব হইল। এই কথাই কি একটি ভগ্ন সংসারের নিদারুণ আর্তস্বরকে ঢাকিতে পারে । পিশাচী । পিশাচী বিহারী এটা কি পুরা ভৎসনা করিয়া বলিল, না, ইহার সঙ্গে