পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৫২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8 Se রবীন্দ্র-রচনাবলী দেখিতে স্থদুরে জামাইবাড়িতে গিয়াছেন। বিনোদিনী প্রতিবেশিনীদের বাড়িতে গেল। তাহারা তাহকে দেখিয়া যেন চকিত হইয়া উঠিল । ও মা, বিনোদিনীর দিব্য রং সাফ হুইয়া উঠিয়াছে, কাপড়চোপড় ফিটফাট, যেন মেমসাহেবের মতো । তাহারা পরস্পরে কী যেন ইশারায় কহিয়া ৰিনোদিনীর প্রতি লক্ষ্য করিয়া মুখচাওয়াচায়ি করিল । যেন কী একটা জনরব শোনা গিয়াছিল, তাহার সহিত লক্ষণ মিলিল । ৰিনোদিনী তাহার পল্লী হইতে সর্বতোভাবে বহু দূরে গিয়া পড়িয়াছে, তাহা পদে-পদে অনুভব করিতে লাগিল । স্বগৃহে তাহার নির্বাসন। কোথাও তাহার এক । মুহূর্তের আরামের স্থান নাই । ডাকঘরের বুড়া পেয়াদা বিনোদিনীর আবাল্যপরিচিত। পরদিন বিনোদিনী যখন পুষ্করিণীর ঘাটে স্নান করিতে উষ্ঠত হইয়াছে, এমন সময় চিঠির ব্যাগ লইয়া পেয়াদাকে পথ দিয়া যাইতে দেখিয়া বিনোদিনী আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না । গামছা ফেলিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া গিয়া তাহাকে ডাকিয়া কহিল, “পাচুদাদা, আমার ब्रिटैिं च्यांहछ् ?” বুড়া কহিল, “না।” বিনোদিনী ব্যগ্র হইয়া কহিল, “থাকিতেও পারে। একবার দেখি ।” বলিয়া পাড়ার অল্প থানপাচ-ছয় চিঠি লইয়া উলটাইয়া-পালটাইয়া দেখিল, কোনোটাই তাহার নহে। বিমর্ষমুখে যখন ঘাটে ফিরিয়া আসিল, তখন তাহার কোনো সখী সকৌতুক কটাক্ষে কহিল, "কী লো বিন্দি, চিঠির জন্যে এত ব্যস্ত কেন।” আর-একজন প্ৰগলভা কহিল, “ভালো ভালো, ডাকের চিঠি আসে এত ভাগ্য কয়জনের। আমাদের তো স্বামী, দেবর, ভাই বিদেশে কাজ করে কিন্তু ডাকের ८°ग्रांलांद्र भग्नां ट्म्न नीं ।” এইরূপে কথায় কথায় পরিহাস ফুটতর ও কটাক্ষ তীক্ষতর হইয়। উঠিতে লাগিল । বিনোদিনী বিহারীকে অনুনয় করিয়া আসিয়াছিল, প্রত্যহ যদি নিতান্ত না ঘটে, তবে অন্তত সপ্তাহে দুইবার তাহাকে কিছু না-হয় তো দুই ছত্রও যেন চিঠি লেখে। আজই বিহারীর চিঠি পাইবার সম্ভাবনা অত্যন্ত বিরল, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা এত অধিক হইয়া উঠিল যে, দূর সম্ভাবনার আশাও বিনোদিনী ছাড়িতে পারিল না । তাহার মনে হইতে লাগিল, যেন কতকাল কলিকাতা ত্যাগ করিয়াছে । মহেন্দ্রের সহিত জড়িত করিয়া বিনোদিনীর নামে নিন্দ গ্রামের ঘরে-ঘরে কিরূপ ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছে, শত্ৰু-মিত্রের কৃপায় বিনোদিনীর কাছে তাহা অগোচর রহিল না । শাস্তি কোথায় ।